বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যে কচ্ছপের তালিকায় মোট ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম রয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় প্রজাতিগুলোর মধ্যে আমাদের আজকের আলোচ্য মুকুটি নদ-কাইট্টা বা নদীর কালী কাইট্টা (বৈজ্ঞানিক নাম: Hardella thurjii) অত্যন্ত অনন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। বর্তমানে আবাসস্থল ধ্বংস এবং নানাবিধ ঝুঁকির কারণে এটি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক একটি সংকটাপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। আমাদের নদী ও জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র সচল রাখতে এই কচ্ছপটির ভূমিকা অপরিসীম।
মুকুটি নদ-কাছিম বা নদীর কালী কাইট্টা: পরিচিতি ও জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
বাংলাদেশের নদীমাতৃক প্রকৃতির জলজ জীববৈচিত্র্যের মধ্যে কচ্ছপ ও কাছিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দেশের নদীগুলোতে প্রাপ্ত বিরল ও অনন্য কচ্ছপগুলোর মধ্যে মুকুটি নদ-কাছিম বা নদীর কালী কাইট্টা (বৈজ্ঞানিক নাম: Hardella thurjii) অন্যতম। এটি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক একটি সংকটাপন্ন (Vulnerable) প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই কচ্ছপটি মূলত ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের নদী অববাহিকায় বসবাস করে।
📊 নদীর কালী কাইট্টার জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Scientific Classification)
জীববিজ্ঞান ও কর্ডাটা পর্বের নিয়মানুযায়ী মুকুটি নদ-কাছিমের সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক টেক্সোনমি বা শ্রেণীবিন্যাস নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
| ধাপ (Rank) | নাম (Taxon) |
|---|---|
| জগৎ (Kingdom) | Animalia (প্রাণী) |
| পর্ব (Phylum) | Chordata (মেরুদণ্ডী) |
| শ্রেণি (Class) | Reptilia (সরীসৃপ) |
| বর্গ (Order) | Testudines (কাছিম/কচ্ছপ) |
| পরিবার (Family) | Geoemydidae (কাইট্টা পরিবার) |
| গণ (Genus) | Hardella Gray, 1870 |
| প্রজাতি (Species) | H. thurjii (Gray, 1831) |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি Hardella গণের অধীনে থাকা একমাত্র অনন্য কচ্ছপ প্রজাতি।
🐢 সাধারণ পরিচিতি ও নামকরণ
এই কচ্ছপটি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন আকর্ষণীয় নামে পরিচিত:
- বাংলা নাম: মুকুটি নদ-কাছিম, মুকুটি নদ-কাইট্টা অথবা নদীর কালী কাইট্টা।
- ইংরেজি নাম: Brahminy River Turtle অথবা Crowned River Turtle।
- বৈজ্ঞানিক নাম: Hardella thurjii ।
এদের মাথার ওপর মুকুটের মতো বিশেষ রঙের রেখা বা নকশা থাকার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এদের ‘ক্রাউনড রিভার টার্টল’ (Crowned River Turtle) বলা হয়ে থাকে।
🐢 মুকুটি নদ-কাইট্টার শারীরিক বর্ণনা ও বৈশিষ্ট্য
মুকুটি নদ-কাইট্টা বা নদীর কালী কাছিমের শারীরিক গঠন এবং আকৃতি অন্যান্য সাধারণ কচ্ছপের চেয়ে বেশ আলাদা। নিচে এদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. যৌন দ্বি-রূপতা (Sexual Dimorphism) ও আকৃতি
এই প্রজাতির কচ্ছপের ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী প্রাণীর মধ্যে এক বিশাল আকৃতিগত পার্থক্য বা যৌন দ্বি-রূপতা দেখা যায়:
- স্ত্রী কাইট্টা: স্ত্রী কাইট্টা ওজনে ও আকারে পুরুষদের চেয়ে অনেক বড় হয়ে থাকে। এদের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
- পুরুষ কাইট্টা: স্ত্রী কাইট্টার তুলনায় পুরুষগুলো বেশ ছোট হয়। এদের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ মাত্র ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
২. মাথা ও আকর্ষণীয় ব্যান্ডের নকশা
- মাথার রং: এদের মাথা গাঢ় বাদামি থেকে কুচকুচে কালো রঙের হয়ে থাকে।
- হলুদ-কমলা ব্যান্ড: মাথায় মূলত চারটি আকর্ষণীয় হলুদ-কমলা রঙের ব্যান্ড বা রেখা থাকে। প্রথমটি তুণ্ডের (নাক/মুখের অগ্রভাগ) শীর্ষভাগে এবং দ্বিতীয়টি নাসারন্ধ্রের নিচে ও চোখের ওপর দিয়ে গিয়ে মাথা ও গ্রীবার (ঘাড়) দুই পাশ বরাবর নিচে নেমে যায়।
- চোয়ালের নকশা: নাসারন্ধ্র থেকে শুরু করে চোখ হয়ে ঘাড়ের পাশ পর্যন্ত একটি প্রশস্ত হলুদ ব্যান্ড এবং চোয়ালের সামনের অংশে ছোট ছোট হলুদ রেখা দৃশ্যমান থাকে।
- চোয়াল ও দাঁত: এদের তুণ্ড বা মুখটি সূচালো ও অভিক্ষেপযুক্ত। চোয়ালের কিনারায় অত্যন্ত মজবুত দাঁত থাকে এবং উপরের চোয়ালের দাঁতগুলো দ্বি-শিখরযুক্ত (Bicuspid) প্রকৃতির।
৩. খোলস বা কৃত্তিকাবর্মের গঠন (Carapace Anatomy)
- গম্বুজ আকৃতি: এদের পিঠের শক্ত খোলস বা কৃত্তিকাবর্মটি গম্বুজ আকৃতির এবং গাঢ় বাদামি কিংবা কালো রঙের হয়। খোলসের কিনারার দিকটা হলুদ রঙের হয়, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিবর্ণ হয়ে যায়। দ্রুত বর্ধনশীল কচ্ছপের ক্ষেত্রে খোলসের পাঁজরে অতিরিক্ত একটি হলুদ ব্যান্ডও দেখা যায়।
- শিল্ড বা আঁইশের বিন্যাস: এদের পিঠের খোলসে ১টি নুকাল (Nuchal) শিল্ড, ১টি অধিলেজ (Supracaudal) শিল্ড, ৫টি মেরু (Vertebral) শিল্ড, ৪ জোড়া পাঁজর শিল্ড এবং ১২ জোড়া প্রান্তীয় (Marginal) শিল্ড থাকে। এর মধ্যে ১ম মেরু শিল্ডটি চওড়ার চেয়ে লম্বায় বেশি এবং ২য় থেকে ৪র্থ মেরু শিল্ডের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান হয়।
৪. বুকস্ত্রাণ বা নিচের খোলস (Plastron)
- इनकी বক্ষস্ত্রাণটি ঈষৎ হলুদ রঙের হয়ে থাকে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি শিল্ড বা আঁইশে দুটি করে বড় ও গাঢ় কালো রঙের ছোপ বা দাগ থাকে (যা এদের উদরেও দেখা যায়)।
- বিজ্ঞানী প্রিটচার্ডের (Pritchard, 1979) তথ্যমতে, এদের আন্তঃফিমোরাল (Inter-femoral) এবং আন্তঃপায়ু শিল্ডের সংযোগস্থলে (Seams) প্রচুর পরিমাণে কালো রঞ্জক বা পিগমেন্ট ছড়ানো থাকে।
৫. পা, আঁইশ ও সাঁতারের ক্ষমতা
- পায়ের রং ও আঁইশ: এদের পাগুলো জলপাই রঙের এবং এতে ছোট ছোট হলুদ দাগ থাকে। পায়ে আড়াআড়িভাবে সাজানো সরু ও বড় বড় আঁইশ থাকে।
- সম্পূর্ণ লিপ্তপাদ: পানিতে দ্রুত সাঁতার কাটার সুবিধার্থে এদের পায়ের আঙুলগুলো সম্পূর্ণ লিপ্তপাদ (Fully Webbed) অর্থাৎ পাতলা চামড়া দ্বারা একে অপরের সাথে জোড়া থাকে।
মুকুটি নদ-কাইট্টার স্বভাব, খাদ্য ও প্রজনন প্রক্রিয়া
মুকুটি নদ-কাইট্টা বা নদীর কালী কাছিমের জীবনযাত্রা এবং বংশবিস্তার প্রক্রিয়া অন্যান্য কচ্ছপের চেয়ে বেশ আলাদা এবং রহস্যময়। নিচে এদের স্বভাব ও প্রজনন চক্রের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. স্বভাব ও শান্ত প্রকৃতি
- সম্পূর্ণ জলজ জীবন: এই কচ্ছপগুলো জীবনের সিংহভাগ সময় পানির নিচেই কাটায়। এরা সম্পূর্ণ জলজ (Aquatic) প্রকৃতির এবং অন্য কচ্ছপদের মতো এদের কদাচিৎ বা খুব কমই ডাঙায় উঠে রৌদ্র পোহাতে (Basking) দেখা যায়।
- বিচরণ ক্ষেত্র: এরা সাধারণত ধীরগতির বা অল্প স্রোতযুক্ত নদী, নদী-খালের ঝোপঝাড়যুক্ত কর্দমাক্ত পরিবেশ, উপকূলীয় মোহনা এবং বড় বড় প্রাকৃতিক জলাশয়ে বাস করে।
- আক্রমণাত্মক আচরণ: সাধারণত এরা বেশ শান্ত প্রকৃতির হলেও কোনো কারণে অসাবধানতাবশত এদের বিরক্ত করলে বা এরা ভয় পেলে প্রচণ্ড জোরে কামড়াতে পারে।
২. খাদ্য তালিকা (Diet)
- বন্য পরিবেশের খাদ্য: এরা মূলত সম্পূর্ণ তৃণভোজী (Herbivorous) বা উদ্ভিদাশী প্রাণী। বন্য বা প্রাকৃতিক পরিবেশে এরা বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ, শ্যাওলা এবং নদীর তলদেশের জলজ আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকে।
- বন্দীদশার খাদ্য: প্রজনন কেন্দ্র বা কৃত্রিম খামারে বন্দীদশায় (Captivity) রাখার সময় এদের প্রধান খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ফলমূল এবং সবুজ শাকসবজি দেওয়া হয়।
৩. ডিম পাড়া ও দীর্ঘতম পরিস্ফুটনকাল (Breeding & Incubation)
- ডিম পাড়ার সময় ও সংখ্যা: স্ত্রী কচ্ছপগুলো সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে ডিম পাড়ে। এরা প্রতি প্রজনন ঋতুতে বালিয়াড়িতে গর্ত করে একসাথে ৩০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত বিপুল সংখ্যায় ডিম দিতে পারে।
- ডিমের আকৃতি ও পরিমাপ: এদের ডিমগুলো দেখতে লম্বাটে-ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে, যা অনেকটা দেশি মুরগির ডিমের মতো দেখায়। ডিমগুলোর গড় পরিমাপ সাধারণত ৪.০ থেকে ৫.৬ সেমি (লম্বা) এবং ২.৮ থেকে ৩.৬ সেমি (চওড়া) হয়ে থাকে।
- দীর্ঘতম পরিস্ফুটনকাল: কচ্ছপ জগতের মধ্যে এদের ডিম ফোটার সময়কাল বেশ দীর্ঘ। ডিম থেকে বাচ্চা বের হতে পরিস্থিতিভেদে ৯ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
- সদ্য প্রস্ফুটিত বাচ্চা: দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডিম ফুটে বের হওয়া সদ্যজাত কচ্ছপের বাচ্চার দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৪.১ থেকে ৪.৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
মুকুটি নদ-কাইট্টার ভৌগোলিক বিস্তৃতি (Geographical Distribution)
মুকুটি নদ-কাইট্টা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রধান নদী অববাহিকার একটি আদি ও স্থানীয় প্রজাতি। নিচে এদের মূল বিচরণক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো:
- বাংলাদেশে বিস্তৃতি: বাংলাদেশের নদীমাতৃক পরিবেশ এই কচ্ছপের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অতীতে এদের প্রায় বাংলাদেশের সর্বত্র—বিশেষ করে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকায় এবং এদের সংযুক্ত বড় বড় নদী-নালা ও বিল অঞ্চলে ব্যাপকভাবে দেখতে পাওয়া যেত। তবে বর্তমানে এদের উপস্থিতি কেবল প্রধান কিছু নদী ও হাওর অঞ্চলের গভীর অববাহিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে।
- আঞ্চলিক বিস্তৃতি: বাংলাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রজাতিটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকা এবং পাকিস্তানের সিন্ধু নদ অববাহিকার প্রধান প্রধান জলজ অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বসবাস করে।
মুকুটি নদ-কাইট্টার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বিলুপ্তির হুমকি
অতীতের অর্থনৈতিক চাহিদা এবং মানুষের অতি-আহরণের কারণেই আজ এই অনন্য জলজ প্রাণীটি চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নিচে এর পেছনের মূল কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
- মাংস ও ডিমের ব্যাপক চাহিদা: এই মুকুটি নদ-কাইট্টার মাংস এবং ডিমের বাণিজ্যিক চাহিদা অত্যন্ত বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশে এই কাছিমটি পাওয়া যায়, সেখানকার স্থানীয় মানুষ এবং জেলেরা কেবল মাংসের জন্য এদের দেদারসে শিকার করে থাকে। এছাড়া নদীর তীরে এদের পাড়া বিপুল সংখ্যার ডিমও মানুষ খাদ্য হিসেবে সংগ্রহ করে ফেলে।
- নির্বংশ হওয়ার আশঙ্কা: কচ্ছপটির ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে যেখানে দীর্ঘ ৯ মাস সময় লাগে, সেখানে বাচ্চা ফোটার আগেই ডিম চুরি এবং পূর্ণাঙ্গ কচ্ছপ শিকারের ফলে এদের প্রাকৃতিকভাবে বংশবৃদ্ধি প্রায় থমকে গেছে। এভাবে অবাধে কাইট্টা শিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংস হতে থাকলে খুব বেশি দিন সময় লাগবে না যখন বাংলাদেশ থেকে এই উপকারী মুকুটি নদ-কাইট্টা চিরতরে নির্বংশ হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে মুকুটি নদ-কাইট্টার বর্তমান অবস্থা
মুকুটি নদ-কাইট্টা বা নদীর কালী কাছিম বর্তমানে আমাদের দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলজ প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। নিচে এর বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থা এবং আইনি সুরক্ষার বিবরণ দেওয়া হলো:
- বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রজাতি: ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ২৫তম খণ্ডের বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এই প্রজাতির কাছিম ‘সংকটাপন্ন’ (Vulnerable) হিসেবে চিহ্নিত হলেও আমাদের বাংলাদেশে এটি ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ, যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে এ দেশ থেকে প্রাণীটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
- বিগত ৫০ বছরের আশঙ্কাজনক হ্রাস: আজ থেকে মাত্র ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশের নদী-নালা ও হাওর অঞ্চলে এই প্রজাতির কাছিম বেশ সচরাচর বা নিয়মিত দেখতে পাওয়া যেত। তবে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ আহরণ, ডিম চুরি এবং ক্রমাগত নদী দূষণের ফলে এদের জনসংখ্যা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
- বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সর্বোচ্চ সুরক্ষা: দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এই মুকুটি নদ-কাছিমকে ‘তফসিল-১’ ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশে এই কাছিমটি সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত এবং একে ধরা, শিকার করা, এর ডিম চুরি করা বা কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশে কচ্ছপ ও কাছিম সংরক্ষণ: বন বিভাগের উদ্ধার অভিযানের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস (২০১০-২০২৬)
- পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম: বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রজাতির অজানা তথ্য
- গঙ্গা তরুণাস্থি কাছিম: খালুয়া কাছিমের বৈশিষ্ট্য, হিংস্র স্বভাব ও প্রজননচক্র
- ত্রি-খিলা স্থল কাইট্টা (Melanochelys tricarinata) পরিচিতি, প্রজনন ও বিস্তার
- হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ: মহাবিপন্ন লম্বা কচ্ছপের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- ক্যান্টরের জাতা তরুণাস্থি কাছিম: উপমহাদেশের বৃহত্তম কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব
- পেলোচেলিস (Pelochelys) কাছিম গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম (Lissemys punctata): পরিচিতি, বাসস্থান ও ডিম পাড়ার অদ্ভুত তথ্য
- মুকুটি নদ-কাইট্টা: নদীর কালী কাছিমের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- মেলানোক্লিস (Melanochelys) কচ্ছপ গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- বাণিজ্যিক কচ্ছপ চাষ পদ্ধতি: চীনা নরম খোলস কচ্ছপ চাষের আধুনিক গাইড
- পরিবেশ রক্ষায় কচ্ছপের ভূমিকা এবং বাংলাদেশে কচ্ছপ বিলুপ্তির কারণ
- বাংলাদেশে প্রাপ্ত ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিমের সম্পূর্ণ তালিকা
- বাটাগুড় বা বোদো কাইট্টা: মহাবিপন্ন কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও প্রজননের সফল ইতিহাস
- বাংলাদেশের সরীসৃপ হচ্ছে কচ্ছপ ও সাপসহ অন্যান্য প্রজাতির বিস্তারিত আলোচনা
- বাংলাদেশের উভচর জলজ ও স্থলজ উভয় পরিবেশে বসবাসকারী ৪১ প্রজাতির প্রাণী
📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References)
১. বইয়ের সূত্র: সুপ্রিয় চাকমা, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড ২৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ: জুন ২০১১, পৃষ্ঠা: ৫৯-৬০।
২. সম্পাদনা ও আপডেট বিজ্ঞপ্তি: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৮ মার্চ ২০১৮ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিক তথ্য বজায় রাখতে আজ ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হয়েছে।
চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)
উত্তর: এই প্রজাতিটি তীব্র যৌন দ্বি-রূপতা প্রদর্শন করে। এদের স্ত্রী কাইট্টা ওজনে ও আকারে পুরুষদের চেয়ে অনেক বড় হয়। স্ত্রী কাইট্টার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৬৫ সেমি হলেও পুরুষ কাইট্টা সর্বোচ্চ মাত্র ২০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।
উত্তর: মুকুটি নদ-কাইট্টা বা নদীর কালী কাইট্টা মূলত সম্পূর্ণ তৃণভোজী বা উদ্ভিদাশী প্রাণী। বন্য পরিবেশে এরা বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ, শ্যাওলা এবং নদীর তলদেশের জলজ আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকে।
উত্তর: কচ্ছপ জগতের মধ্যে এদের ডিম ফোটার সময়কাল সবচেয়ে দীর্ঘ। স্ত্রী কাছিমের পাড়া ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হতে পরিস্থিতিভেদে ৯ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
উত্তর: এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্থানীয় প্রজাতি। এটি বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলের প্রধান নদী অববাহিকাসহ ভারতের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী এবং পাকিস্তানের সিন্ধু নদে প্রাকৃতিকভাবে বসবাস করে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।