সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম (Lissemys punctata): পরিচিতি, বাসস্থান ও ডিম পাড়ার অদ্ভুত তথ্য

বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ তালিকায় মোট ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম রয়েছে। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে সুন্দি কাছিম বা সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম (বৈজ্ঞানিক নাম: Lissemys punctata) অত্যন্ত সুপরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। স্থানীয়ভাবে অনেকে একে ‘সিন্ধু কাছিম’ নামেও ডেকে থাকেন। একসময় দেশের মিষ্টি পানির জলাশয়ে এদের প্রচুর দেখা মিললেও, বর্তমানে অতিরিক্ত শিকার ও আবাসন সংকটের কারণে এটি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক একটি সংকটাপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত।

সুন্দি তরুণাস্থি কাছিমের বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস ও পরিচিতি

সুন্দি কাছিম বা সিন্ধু কাছিম মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের মিষ্টি পানির জলাশয়ের একটি অতি পরিচিত প্রজাতি। এর বৈজ্ঞানিক ট্যাক্সোনমি এবং পরিচিতির বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:

সাধারণ পরিচিতি

  • বাংলা নাম: সুন্দি কাছিম, সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম অথবা সিন্ধু কাছিম।
  • স্থানীয় নাম: উবা কাছিম।
  • ইংরেজি নাম: Spotted Flapshell Turtle অথবা Indian Flapshell Turtle।
  • বৈজ্ঞানিক নাম: Lissemys punctata (Lacépède, 1788)।
  • প্রতিনাম বা সমনাম (Synonyms): Testudo punctata, Emyda punctata, Emyda granosa, Lissemys punctata

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Scientific Classification)

ধাপ (Rank)নাম (Taxon)
জগৎ (Kingdom)Animalia (প্রাণী)
পর্ব (Phylum)Chordata (মেরুদণ্ডী)
শ্রেণি (Class)Reptilia (সরীসৃপ)
বর্গ (Order)Testudines (কাছিম/কচ্ছপ)
পরিবার (Family)Trionychidae (তরুণাস্থি কাছিম পরিবার)
গণ (Genus)Lissemys Gray, 1855
প্রজাতি (Species)L. punctata

🐢 সুন্দি বা সিন্ধু কাছিমের শারীরিক বর্ণনা ও বৈশিষ্ট্য

সুন্দি কাছিম বা উবা কাছিম তার নরম খোলস এবং শরীরের বিশেষ গঠনের জন্য কাছিম জগতে বেশ অনন্য। নিচে এদের শারীরিক কাঠামোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. আকৃতি ও লিঙ্গভেদ

  • দৈর্ঘ্য: পূর্ণবয়স্ক সুন্দি কাছিমের দেহ তুলনামূলকভাবে ছোট হয়। এদের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৫ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • লিঙ্গভেদ: এই প্রজাতির স্ত্রী কাছিমগুলো পুরুষদের তুলনায় আকারে বেশ বড় হয়। এছাড়া পুরুষ কাছিমের লেজ দীর্ঘ ও পুরু হয়, অন্যদিকে স্ত্রী কাছিমের লেজ কিছুটা খাটো ও মোটাসোটা প্রকৃতির হয়ে থাকে।

২. গায়ের রং ও আকর্ষণীয় হলুদ দাগের নকশা

  • দেহের রং: এদের পিঠের নরম খোলস বা কৃত্তিকাবর্মটি জলপাই-বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি রঙের হয়ে থাকে। এর ওপর চমৎকার বৃত্তাকার হলুদ রঙের দাগ বা স্পট দেখা যায়।
  • মাথা ও ঘাড়ের রেখা: এদের মাথায় অসংখ্য লম্বা ও প্রশস্ত হলুদ দাগ থাকে। সাধারণত এদের তুণ্ডে (নাক/মুখের অগ্রভাগ) একটি, চোখের মাঝখানে একটি, চোখের পিছন থেকে কান বা টিম্প্যানাম পর্যন্ত একটি এবং মুখের কোণ থেকে ঘাড় বরাবর আরেকটি রেখা প্রসারিত থাকে। এদের ঘাড় বা গ্রীবাতেও এক সারি আকর্ষণীয় হলুদ দাগ থাকে।
  • নিচের অংশ: এদের নিচের নরম অংশ বা বক্ষস্ত্রাণটি সাধারণত সাদা বা ক্রিম রঙের হয়ে থাকে।

৩. খোলসের অনন্য গঠন ও ফ্লাপ (Flap) ব্যবস্থা

সুন্দি কাছিম ‘Trionychidae’ বা তরুণাস্থি কাছিম পরিবারের সদস্য হওয়ায় এদের খোলসের গঠন খুবই বিশেষ:

  • নরম ত্বক ও ফুসকুড়ি: এদের খোলস ও বুকস্ত্রাণ শক্ত আঁইশের বদলে নরম ও দানাযুক্ত ত্বক দ্বারা আবৃত থাকে। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা বাচ্চার ক্ষেত্রে পিঠের ত্বক কিছুটা কুঁচকানো থাকে এবং লম্বালম্বি সারিতে ছোট ছোট ফুসকুঁড়ি দেখা যায়।
  • লুকানোর বিশেষ লতি (Flaps): এদের খোলসের পিছনের দুই পাশে নমনীয় বা নরম চামড়ার লতি (Flaps) থাকে। এই বিশেষ ফ্ল্যাপগুলোর কারণেই একে ইংরেজিতে ‘Flapshell Turtle’ বলা হয়। কাছিমটি যখন ভয় পেয়ে খোলসের ভেতরে হাত-পা গুটিয়ে নেয়, তখন এই চামড়ার লতিগুলো দরজার মতো বন্ধ হয়ে পা দুটিকে সম্পূর্ণ ঢেকে ও সুরক্ষিত রাখে।
  • অস্থি ও শিল্ডের বিন্যাস: এদের দেহে বৃত্তাকার সিরিজে বিশেষ অস্থি বা হাড় থাকে, যা এদের এই গোত্রের অন্য কাছিম থেকে আলাদা করে। এদের খোলসে প্রিনুকাল অস্থি উপস্থিত থাকে এবং ৭ বা ৮টি নিউরাল শিল্ড একটি সিরিজে সাজানো থাকে। এদের ১ম প্রান্তীয় (Marginal) শিল্ডটি আকারে বেশ বড় হয়।

৪. মুখ, পা ও নখর

  • তুণ্ড: এদের মুখের সামনের অংশ বা তুণ্ডটি বেশ ছোট, যার দৈর্ঘ্য চোখের ব্যাসের চেয়েও কম।
  • নখরযুক্ত পা: এদের পাগুলো জলপাই বা বাদামি রঙের হয়। পানিতে দ্রুত সাঁতার কাটার জন্য এদের আঙুলগুলো সম্পূর্ণ লিপ্তপাদ (চামড়া দ্বারা জোড়া) হলেও প্রতিটি পায়ে ৩টি করে ধারালো নখর বা নখ থাকে।

সুন্দি কাছিমের স্বভাব, খাদ্য ও প্রজনন প্রক্রিয়া

সুন্দি বা সিন্ধু কাছিমের জীবনযাত্রা এবং এদের বংশবিস্তারের বৈজ্ঞানিক আচরণ কাছিম জগতের অন্যতম এক আকর্ষণীয় বিষয়। নিচে এদের স্বভাব, খাদ্য এবং প্রজনন চক্রের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. স্বভাব ও বাসস্থান (Habitats)

  • লুকিয়ে থাকার প্রবণতা: এরা প্রধানত পুকুর, নদী, নালা এবং বিলের মিষ্টি পানিতে বাস করে। তবে এরা বেশির ভাগ সময় পানির নিচে কাদা বা বালুর মধ্যে শরীরের অর্ধেক অংশ ডুবিয়ে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে।
  • শিকারের কৌশল: কাদার ভেতর লুকিয়ে থাকলেও এদের ঘাড় বা গ্রীবা অনেক লম্বা হওয়ায় পানির ওপর দিয়ে আসা শিকারকে এরা চোখের পলকে দ্রুত ধরে ফেলতে পারে।
  • রৌদ্র পোহানো (Basking): এরা মূলত নিশাচর। দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকলেও কখনো কখনো দুপুরের কড়া রোদে পানির ওপর ভেসে থাকা জলজ আগাছা বা শ্যাওলার ওপর উঠে এদের রৌদ্র পোহাতে দেখা যায়।
  • শীত ও গ্রীষ্মনিদ্রা: শীতকালে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) এরা পানির নিচে কাদার ভেতর ‘শীতনিদ্রা’ (Hibernation) যাপন করে। আবার প্রচণ্ড গরমে বা খরায় জলাশয় শুকিয়ে গেলে এরা আগাছার নিচে ‘গ্রীষ্মনিদ্রা’ (Aestivation) কাটায়।

২. খাদ্য তালিকা (Diet)

সুন্দি কাছিম মূলত সর্বভুক এবং জলাশয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা মৃতভোজী (Scavenger) হিসেবে পরিচিত:

  • এরা রাতের বেলা জলাশয়ের তীরে এসে মরা, পচা-গলিত জৈব পদার্থ খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখে।
  • এছাড়া এদের নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রয়েছে ছোট মাছ, ব্যাঙ, জলজ কীটপতঙ্গ, শামুক এবং ঝিনুক।

৩. বিস্ময়কর প্রজনন আচার ও যৌন মিলন

এদের প্রজনন ঋতু শুরু হয় এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে। এই সময়ে এদের মধ্যে এক অনন্য প্রেমের আচরণ দেখা যায়:

  • ** courtship বা মান ভাঙানো:** যৌন মিলনের আগে পুরুষ কাছিমটি স্ত্রী কাছিমের চারপাশে অবিরাম সাঁতার কেটে ঘুরে বেড়ায়। এরপর সে তার থুতনি দিয়ে স্ত্রী কাছিমের বক্ষস্ত্রাণে (Plastron) অনবরত আলতো করে ঠোকর মারতে থাকে।
  • স্ত্রীর সাড়া দেওয়া: পুরুষ কাছিমের ঠোকরে সাড়া দিয়ে স্ত্রী কাছিমটি তার লম্বা ঘাড় প্রসারিত করে প্রতিবারে ৩-৪ বার মাথা উপর-নিচ করে। এভাবে প্রায় ৫ থেকে ৮ বার মাথা ঝাঁকিয়ে সে মিলনের সম্মতি জানায়।
  • মিলন প্রক্রিয়া: সম্মতি পাওয়ার পর পুরুষ কাছিমটি পিছন দিক থেকে স্ত্রী কাছিমের খোলসের ওপর ওঠে। মিলনের শেষ পর্যায়ে পুরুষটি খোলস ছেড়ে দিয়ে স্ত্রীর বিপরীত দিকে অবস্থান নেয়। এই পুরো মিলন প্রক্রিয়াটি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলে। মিলন শেষে স্ত্রী কাছিমটি পুরুষটিকে মৃদু আঘাত করে নিজে থেকে আলাদা হয়ে যায়।

৪. বাসা তৈরি ও ডিম পাড়ার অদ্ভুত তথ্য (Oviposition)

  • বাসা নির্মাণ: সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে এরা ডিম পাড়ার জন্য বাসা তৈরি করে। জলাশয়ের কাছাকাছি রোদযুক্ত স্থানের নরম দোআঁশ মাটিতে স্ত্রী কাছিম সাবধানে গর্ত করে। এই বাসার গভীরতা সাধারণত ১৫ থেকে ২০ সেমি এবং চওড়া ৮ থেকে ১৬ সেমি পর্যন্ত হয়।
  • ডিম পাড়ার বয়স ও সংখ্যা: একটি স্ত্রী কাছিম সাধারণত ২ থেকে ৩ বছর বয়স থেকে ডিম পাড়া (Oviposition) শুরু করে। এরা প্রতিবারে ২ থেকে ১৬টি করে ডিম দেয় এবং একটি সুস্থ কাছিম বছরে সর্বোচ্চ ৩৪ থেকে ৪০টি পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে।
  • ডিমের আকৃতি ও দীর্ঘতম পরিস্ফুটনকাল: এদের ডিমগুলো ধবধবে সাদা ও সম্পূর্ণ গোলাকার হয়, যার পরিমাপ ২৬.০-২৮.৬ মিমি। কচ্ছপ জগতের মধ্যে এদের ডিম ফোটার সময়কাল বেশ দীর্ঘ; ডিম থেকে বাচ্চা বের হতে ২৪১ থেকে ৪০৯ দিন (প্রায় ৮ থেকে ১৩ মাস) পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে!
  • সদ্যজাত পোনা: ডিম ফুটে বের হওয়া সদ্যজাত সুন্দি কাছিমের বাচ্চার দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩৪.৮ থেকে ৩৭.০ মিলিমিটার হয়ে থাকে।

সুন্দি তরুণাস্থি কাছিমের ভৌগোলিক বিস্তার (Geographical Distribution)

সুন্দি কাছিম মূলত দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অত্যন্ত পরিচিত ও আদি প্রজাতি। নিচে এদের মূল বিচরণক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো:

  • বাংলাদেশে বিস্তার: বাংলাদেশের কচ্ছপগুলোর মধ্যে সুন্দি কাছিম অন্যতম একটি প্রজাতি, যা দেশের সর্বত্র ব্যাপক আকারে বিস্তৃত। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলার পুকুর, দীঘি, বিল, হাওর ও ধীরগতির নদীতে এদের প্রাকৃতিকভাবে দেখতে পাওয়া যায়।
  • আন্তর্জাতিক বিস্তার: বাংলাদেশের বাইরে এই প্রজাতিটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় প্রচুর পরিমাণে বাস করে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের বিভিন্ন মিঠাপানির জলাশয়েও এদের ভৌগোলিক উপস্থিতি রয়েছে।

সুন্দি কাছিমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও অবৈধ পাচারের হুমকি

সুন্দি কাছিম বা সিন্ধু কাছিম দেশের জলজ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী হলেও, মানুষের অতি-আহরণ এবং অবৈধ বাণিজ্যের কারণে এই প্রজাতিটি আজ চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

  • খাদ্য হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার: বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (আদিবাসী) এবং সনাতন (হিন্দু) সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই কাছিমের মাংস অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্য। মাংসের পাশাপাশি নদী বা পুকুরের তীর থেকে এদের পাড়া পুষ্টিকর ডিমগুলোও স্থানীয় মানুষ খাদ্য হিসেবে নিয়মিত সংগ্রহ করে ফেলে।
  • আইনি নিষেধাজ্ঞা বনাম চোরাচালান: যদিও দেশের বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী বন্য পরিবেশ থেকে এই সুন্দি কাছিম বাণিজ্যিকভাবে ধরা, বিক্রি বা শিকার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবুও স্থানীয় বাজারগুলোতে গোপনে প্রচুর পরিমাণে এই কাছিম কেনাবেচা হতে দেখা যায়।
  • ভারতে অবৈধ পাচার: শুধু দেশের বাজারে বিক্রিই নয়, অধিক মুনাফার লোভে অসাধু শিকারিরা এই বিপন্ন কাছিমগুলোকে সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ব্যাপক হারে পাচার করে থাকে। এই অবাধ চোরাচালান ও শিকারের কারণে প্রাকৃতিকভাবে এদের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।

সুন্দর জলজ বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্য শৃঙ্খলে সুন্দি কাছিমের ভূমিকা

প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খল (Food Chain) বজায় রাখতে এবং পানির পরিবেশ সুস্থ রাখতে সুন্দি কাছিম পর্দার আড়ালে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করে:

  • পানিতে অক্সিজেনের সমতা রক্ষা: সুন্দি কাছিম যখন পানির গভীর থেকে বিভিন্ন স্তরে সাঁতার কাটে এবং কাদা খুঁড়ে বিচরণ করে, তখন পানির নিচে এক ধরনের মৃদু আন্দোলন বা তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। এদের এই অনবরত চলাচলের ফলে পানির বিভিন্ন স্তরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved Oxygen) সঠিক মিশ্রণ ও সমতা বজায় থাকে, যা মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
  • প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল বজায় রাখা: সুন্দি কাছিমের ডিম এবং সদ্যজাত ছোট বাচ্চারা যখন ডিম ফুটে বের হওয়ার পর নদীর তীরে বা ডাঙায় আসে, তখন বকের মতো জলজ পাখি, গুইসাপ, শিয়াল এবং অন্যান্য বড় শিকারী বন্যপ্রাণী এদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে এরা প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অবদান রাখে।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে সুন্দি কাছিমের বর্তমান অবস্থা

সুন্দি কাছিম বা সিন্ধু কাছিম বাংলাদেশের সর্বত্র ব্যাপক আকারে বিস্তৃত থাকলেও, মানুষের নানাবিধ অসচেতন কর্মকাণ্ডের কারণে বর্তমানে এদের নিরাপদ বংশবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়েছে।

  • বিশ্বব্যাপী সংরক্ষণ অবস্থা (IUCN Red List): বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংগঠন আইইউসিএন (IUCN)-এর লাল তালিকায় সুন্দি কাছিম বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘সংকটগ্রস্ত’ বা বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় নেই। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিকভাবে অন্যান্য দেশের বন্য পরিবেশে এদের সংখ্যা এখনও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।
  • স্থানীয় হুমকি ও বিলুপ্তির ঝুঁকি: বিশ্বজুড়ে এদের অবস্থা ভালো হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটি একটু ভিন্ন। আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক কাছিম ও এদের পুষ্টিকর ডিম মাত্রাতিরিক্ত হারে বন্য পরিবেশ থেকে আহরণ (শিকার) করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি নদী-নালা ভরাট ও প্রাকৃতিক আবাসন ধ্বংসের কারণে স্থানীয়ভাবে এই প্রজাতিটি দিন দিন মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
  • বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সর্বোচ্চ সুরক্ষা: দেশের জীববৈচিত্র্য ও জলজ পরিবেশ রক্ষা করতে বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এই সুন্দি কাছিমকে ‘তফসিল-১’ ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, আন্তর্জাতিকভাবে এদের সংখ্যা যেমনই থাকুক না কেন, বাংলাদেশে এই কাছিমটি সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত এবং একে ধরা, শিকার করা, এর ডিম নষ্ট করা কিংবা কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
  • ভবিষ্যৎ করণীয়: এই উপকারী প্রজাতিটিকে আমাদের জলাশয়গুলোতে টিকিয়ে রাখতে হলে এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলগুলো রক্ষা করা এবং স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

উপপ্রজাতি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্দি কাছিমের গুরুত্ব

সুন্দি কাছিম বা সিন্ধু কাছিমের বৈজ্ঞানিক উপপ্রজাতি এবং কিছু নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এর সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে:

  • ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও ঐতিহ্য: দক্ষিণ এশিয়ার কিছু নির্দিষ্ট অমুসলিম ও সনাতন (হিন্দু) সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই কাছিমটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের সময়ে তীর্থযাত্রী বা পুণ্যার্থীদের বিশেষ ভোজ হিসেবে এই কাছিমের মাংস পরিবেশন করার প্রাচীন লোক-ঐতিহ্য রয়েছে।
  • উপপ্রজাতি ও বাংলাদেশের বিশেষ ‘অ্যান্ডারসনি’ (L. p. andersoni): বিশ্বজুড়ে সুন্দি কাছিমের মোট ৩টি বৈজ্ঞানিক উপপ্রজাতি (Subspecies) রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশে মূলত অ্যান্ডারসনি সুন্দি কাছিম (বৈজ্ঞানিক নাম: Lissemys punctata andersoni) উপপ্রজাতিটি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়।
  • অ্যান্ডারসনি উপপ্রজাতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য: এই বিশেষ উপপ্রজাতির কচ্ছপগুলোর পিঠের শক্ত খোলস বা কৃত্তিকাবর্মটি সাধারণত আকর্ষণীয় ধূসর-সবুজ রঙের হয়ে থাকে। খোলসের কিনারার দিকের অংশে স্পষ্ট কালো রঙের বর্ডার এবং সুন্দর বৃত্তাকার হলুদ দাগ বা স্পট থাকে। এদের নিচের বক্ষস্ত্রাণটি সম্পূর্ণ ধবধবে সাদা রঙের হয় এবং এদের আন্তঃবক্ষস্ত্রাণ বা বুকের ভেতরের হাড়ের গঠনে ও কড়াতে বেশ দৃশ্যমান তারতম্য বা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

📝 উপসংহার (Conclusion)

পরিশেষে বলা যায়, সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম বা সিন্ধু কাছিম আমাদের গ্রামীণ জলাশয় ও নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা সচল রাখতে এক নিরলস ঝাড়ুদারের ভূমিকা পালন করে। রাতের বেলা পচা-গলা বর্জ্য খেয়ে এরা প্রাকৃতিকভাবেই পানি পরিষ্কার রাখে। তবে অতিরিক্ত শিকার, ডিম চুরি এবং ভারতে অবৈধ পাচারের কারণে এই উপকারী প্রাণীটি আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বন্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের স্থানীয় বাজারগুলোতে এদের কেনাবেচা বন্ধ করা এবং বন্যপ্রাণী আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References)

১. বইয়ের সূত্র: সুপ্রিয় চাকমা, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড ২৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ: জুন ২০১১, পৃষ্ঠা: ৭৩-৭৪।
২. সম্পাদনা ও আপডেট বিজ্ঞপ্তি: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিক তথ্য বজায় রাখতে আজ ২০ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হয়েছে।

চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)

১. বাংলাদেশে কোন সুন্দি কাছিম পাওয়া যায় এবং এর বৈশিষ্ট্য কী?

উত্তর: বিশ্বজুড়ে সুন্দি কাছিমের ৩টি উপপ্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে মূলত অ্যান্ডারসনি সুন্দি কাছিম (Lissemys punctata andersoni) পাওয়া যায়। এদের পিঠের খোলসটি ধূসর-সবুজ রঙের হয়, যার কিনারায় কালো বর্ডার এবং খোলসের ওপর চমৎকার গোলাকার হলুদ দাগ থাকে।

২. সুন্দি কাছিমকে ইংরেজিতে ‘Flapshell Turtle’ বা ফ্লাপশেল কচ্ছপ বলা হয় কেন?

উত্তর: এই কাছিমের খোলসের পিছনের দুই পাশে নমনীয় চামড়ার বিশেষ লতি বা ফ্ল্যাপ (Flaps) থাকে। কাছিমটি যখন ভয় পেয়ে খোলসের ভেতরে হাত-পা গুটিয়ে নেয়, তখন এই চামড়ার ফ্ল্যাপগুলো দরজার মতো বন্ধ হয়ে পা দুটিকে সম্পূর্ণ ঢেকে ও সুরক্ষিত রাখে। এজন্যই এদের ফ্লাপশেল টার্টল বলা হয়।

৩. সুন্দি কাছিমের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে কত দিন সময় লাগে?

উত্তর: কাছিম জগতের মধ্যে সুন্দি কাছিমের ডিম ফোটার সময়কাল অন্যতম দীর্ঘ। স্ত্রী কাছিমের দোআঁশ মাটিতে পাড়া গোলাকার ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হতে পরিস্থিতি ও আবহাওয়াভেদে ২৪১ থেকে ৪০৯ দিন (প্রায় ৮ থেকে ১৩ মাস) পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে!

৪. পানিতে অক্সিজেনের সমতা রক্ষায় সুন্দি কাছিম কীভাবে সাহায্য করে?

উত্তর: সুন্দি কাছিম যখন পানির গভীর থেকে বিভিন্ন স্তরে সাঁতার কাটে এবং কাদা খুঁড়ে বিচরণ করে, তখন পানিতে এক ধরনের মৃদু তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। এদের এই অনবরত চলাচলের ফলে পানির বিভিন্ন স্তরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved Oxygen) সঠিক মিশ্রণ ও সমতা বজায় থাকে, যা মাছের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

৫. বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে সুন্দি কাছিমের বর্তমান আইনি অবস্থা কী?

উত্তর: আইইউসিএন (IUCN) লাল তালিকা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী এই প্রজাতিটি বর্তমানে সংকটগ্রস্ত বা বিপন্ন নয়। তবে বাংলাদেশে অতিরিক্ত শিকার ও পাচারের কারণে এরা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এটি ‘তফসিল-১’ ভুক্ত একটি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত প্রাণী, যা ধরা বা শিকার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!