আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > বৃক্ষ > শিশু গাছ-এর নানাবিধ ঔষধি গুণ ও প্রযোগ পদ্ধতি

শিশু গাছ-এর নানাবিধ ঔষধি গুণ ও প্রযোগ পদ্ধতি

শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট বৃহৎ গাছ। উচ্চতায় ৪০। ৫০ ফুট হ’তে দেখা যায়, ছাল ধূসর বর্ণ, অমসৃণ, পুরনো হলে লম্বালম্বিভাবে কাটা কাটা দাগ হয়ে থাকে। পাতা সক্ষম রোমশ, দেখতে অনেকটা গোলাকার হ’লেও অগ্রভাগ ক্রমশ সর। ডিসেম্বরের প্রারম্ভে পুরনো পাতাগুলি ঝ’রে পড়তে থাকে এবং ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে আবার নতুন পাতা গজায়।

সাধারণতঃ মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে ছোট ছোট পুষ্পদণ্ডে পীতাভ বর্ণের অনেক ফুল ফোটে। তারপরে শুটি হয়, এগুলো চেপ্টা, পাতলা, রোমশ ও ফিকে ধূসর বর্ণের হয়, আকারে আন্দাজ দুই ইঞ্চি লম্বা, সাধারণতঃ নভেম্বর মাস থেকে পাকতে শুরু করে। শুটির বীজগুলি দেখতে অনেকটা বাংলা পাঁচ-এর মত, লম্বায় ৪ ইঞ্চি।

ভারতের প্রায় সর্বত্রই অল্পবিস্তর দেখা যায়, তবে স্বাভাবিকভাবে জন্মে হিমালয়ের ৪ হাজার ফুট উচু পর্যন্ত স্থানে, নেপালে, আসামে; এভিন্ন প্রশস্ত রাজপথের ধারেও রোপণ করা হয়। এর সংস্কৃত নাম শিংশপা, বাংলায় বলে শিশু গাছ, হিন্দিতে শিশাই। এর বোটানিক্যাল নাম Dalbergia sissoo Roxb., ফ্যামিলি Papilionaceae. ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ-ছাল ও পাতা।

শিশু গাছ-এর উপকারিতা:

এটি কাজ করে রসবহ স্রোত, মূত্রবহ স্রোত ও রক্তবহ স্রোতে। তবে এটি গর্ভবতী নারীর ব্যবহার নিষেধ।

১. রক্ত বমনে: বমি হলে অথবা দাস্ত হ’লে (সে যেকোন কারণেই হোক) শিশুপাতার রস ১ চা-চামচ একটু দুধে মিশিয়ে একবার অথবা দুই বার খেতে হবে (সকালে ও বৈকালে), সেই দিনই রক্তস্রতি বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজন হ’লে আরও দুই একদিন খাওয়া যায়।

২. ঋতুস্রাবের আধিক্যে: মাসিকের দোষ, হয়তো সময় হয়নি, অথবা হঠাৎ হ’য়ে গেল কিম্বা বেশী পরিমাণে হ’চ্ছে— শিশুপাতা ৮। ১০ গ্রাম (কাঁচা) অথবা শঙ্ক ৫ গ্রাম ৩। ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছে’কে সেই জল সকালে ও বৈকালে দু’বারে খেতে হবে। একদিনে একেবারে বন্ধ না হলে ২। ৩ দিন খেতে হবে। এভিন্ন ছাল (বক্ষত্বক) ১০। ১২ গ্রাম থেতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করতে হবে, সেটা আন্দাজ এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছে’কে সেই জলটা খেলেও চলবে।

আরো পড়ুন:  কাজুবাদাম-এর বারোটি ভেষজ গুণ ও প্রয়োগ

৩. রক্তার্শে: মূলের সঙ্গে অথবা দাস্ত হওয়ার পর প্রায়ই রক্ত পড়ে। এক্ষেত্রে শিশুছাল ৫ গ্রাম (শুষ্ক), নইলে কাঁচা ১০ গ্রাম থেতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করার পর আন্দাজ এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছে’কে সেই জলটা সকালে অথবা বৈকালে খেতে হবে, যদি এটাতে রক্তপড়া বন্ধ না হয়, তাহ’লে ছালের মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। তবে বেশ কিছুদিন খেলে অর্শের অসুবিধেটা চলে যাবে।

৪. মেদ হ্রাসে: শরীরে মেদ বেড়েই চলেছে, কমাতে চান? সেক্ষেত্রে শিশুছাল ২০ গ্রাম (শুকনো) কিছু সময় ভিজিয়ে রাখার পর তাকে থেতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করতে হবে, যখন আন্দাজ এক কাপ থাকবে তখন তাকে নামিয়ে, ছে’কে, সেই জলটা প্রত্যহ সকালে (কিছু খাওয়ার পর) খেতে হবে। তা না হলে বৈকালেও খাওয়া যায়। এইভাবে মাসখানেক খেলে উল্লেখযোগ্য মেদ হ্রাস পাবে।

৫. জ্বালা মেহে: যে মেহ রোগে জ্বালা থাকে, তার সঙ্গে চটচটে ধাতু পড়ে, সেক্ষেত্রে শিশু গাছের মূলের ছাল ১০/১৫ গ্রাম (শঙ্ক) একটু থেতো ক’রে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করতে হবে। আন্দাজ এক কাপ অবশিষ্ট থাকতে নামিয়ে, ছে’কে, সেই ক্বাথটা সকালে ও বৈকালে দু’বারে খেতে হবে। এইভাবে দুই-তিন দিন খেলেই ওই জ্ব্বালাটাও কমে যাবে এবং ধাতুর স্রাবটাও আর থাকবে না।

৬. গৃধ্রসীতে (সায়েটিকায়): একে আমরা সাধারণে সায়েটিকা বাত বলি। পায়ের শিরায় দুর্বিষহ যন্ত্রণা হয়, মনে হয় যেন মাংসগুলো খাবলে ছিঁড়ে খাচ্ছে। এক্ষেত্রে শিশুছাল ১৫। ২০ গ্রাম (শুকনা) কিছু সময় ভিজিয়ে রেখে তাকে থেতো ক’রে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করতে হবে, সেটা আন্দাজ এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেকে প্রত্যহ একবার করে কয়েকদিন খেতে হবে। এর দ্বারা বাতের যন্ত্রণার উপশম হবে। তবে আরও কিছুদিন খেলে ওই রোগের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন:  পাতালপুর দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ লতা

৭. বাতরক্তে: এই রোগ শরীরে বাসা বাঁধলে যেখানে সেখানে ফোঁড় ওঠে, বিশেষ করে হাতে ও পায়ে; সেক্ষেত্রে শিশু গাছ-এর কাঠের সারাংশ গুড়া ক’রে ২০ গ্রাম নিয়ে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করাতে হবে, সেটা আন্দাজ এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে সেই জলটা প্রত্যহ সকালে ও বৈকালে দু’বারে খেতে হবে; এটা মাসখানেক ব্যবহার করলে ওই বাতরকজনিত উপসর্গগুলি আর আসবে না।

বাহ্য-ব্যবহার

৮. দূষিত ক্ষতে: শিশুকাঠ সিদ্ধ করার পর সেটাকে ছেকে ঘন সার করে চটচটে করে ক্ষতে লাগালে ক্ষত সেরে যায়।

৯. যোনিক্ষতে: সাদা পুঁজের মত প্রায় সারা দিনই স্রাব হ’তে থাকে, ভিতরে আড়ষ্ট ব্যথা, শরীর আস্তে আস্তে ক্ষীণ হ’চ্ছে; সেক্ষেত্রে শিশুপাতা ১০ গ্রাম ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে আন্দাজ ২ কাপ থাকতে নামিয়ে, ছে’কে, সেই জলের ডুস দিতে হবে। এইভাবে ৩। ৪ দিন দিলে ক্ষত সেরে যাবে।

CHEMICAL COMPOSITION

Dalbergia sissoo Roxb.

Analysis of heart wood:- Essential oil 5.35%; bisaboline 10%; merolidol 66.4% and unsaponin matter (sterol) 2.36%. Essential oils :- Myristic 5.56%; palmitic 21.8%; stearic 24%; arachi. dic 19.4%; linoleic 10.8% and oleic 9.4%. Analysis of leaves :— Crude. protein 12.6%; ether extract 2-4.9%; crude fibre 12.5-26.1%; N-free extract 42.1-54.8%; ash 6.6-12%; mineral matter 1-3% and bitter substances. Pods contain tannin 2%.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৫, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৩, পৃষ্ঠা, ১১৫-১১৬।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Vinayaraj

Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page