আন্তোনিও গ্রামসি ছিলেন অতি আশ্চর্য রকমের আবর্জনা সৃষ্টিকারী

আন্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১ -১৯৩৭) ছিলেন ইতালীয় দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিক। তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ভাববাদী দার্শনিক বেনেদেত্তো ক্রোচে’র চিন্তায় প্রভাবিত হন। তুরিনের শ্রমিক আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়ে তিনি ইতালির সমাজতান্ত্রিক দলে যােগ দেন এবং সমাজতন্ত্রী পত্রপত্রিকায় লেখা দিতে শুরু করেন। দেশের পশ্চাৎপদ কৃষি-অর্থনীতি ও শিল্পসমৃদ্ধ শহরজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুভব করেন যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে হলে ইতালিতে লােকগ্রাহ্য জাতীয় পটভূমিকায় শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের মধ্যে সাযুজ্য থাকা চাই।[১]

অক্টোবর বিপ্লবকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন যে শিল্পে অনুন্নত রাশিয়ায় সংঘটিত বিপ্লব মার্কসীয় ইতিহাসতত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারিতে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠায় গ্রামসির ছিল বিশেষ ভূমিকা। মস্কোয় কমিন্টার্নের কাজেও তিনি কিছুকাল যুক্ত ছিলেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ইতালির পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন এবং পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে গ্রামসিকে মুসােলিনি কারারুদ্ধ করেন।

কারাগারে তিনি যেসব দিনলিপি রচনা করেন সেগুলি যুদ্ধোত্তর ইউরােপে বিশেষ করে সােভিয়েত ইউনিয়নের সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী মহলে বিপুল আলােড়ন সৃষ্টি করে। মার্কসীয় রাষ্ট্রচিন্তায় সেগুলি নতুন দিকদর্শিকা হিসেবে তারা স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। মার্কসবাদের কয়েকটি তত্ত্বকে তিনি নতুন আকারে দাঁড় করিয়েছেন বলে বিভিন্ন মহল প্রচার শুরু করে, তারা উল্লেখ করে গ্রামসি বিশেষ করে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বটিকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। তাতে তিনি ইতালীয় অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান, চেতনা ও সংস্কৃতির ব্যঞ্জনা সঞ্চারিত করেছেন।

আন্তোনিও গ্রামসিকে প্রগতিশীল বলা যায়। কিন্তু গ্রামসি কোনোভাবেই মার্কসবাদী নন, লেনিনবাদী হবার তো প্রশ্নই আসে না। গ্রামসিকে বিপ্লবী বলা যায় সেই অর্থে, ঠিক যে অর্থে এরিস্টটল বিপ্লবকে একই শ্রেণির বা বিভিন্ন শ্রেণির ক্ষমতার হস্তান্তর ও পরিবর্তনকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ বিপ্লবকে আমরা যদি সমাজবিপ্লব পর্যন্ত প্রসারিত না করি, সেরকম বিবেচনায় নিলেই গ্রামসি বিপ্লবী। তবে বিশ শতকের সাম্যবাদী ও প্রলেতারিয় বিপ্লবী বৈশিষ্ট্য উনার ভেতরে খুব কমই আছে।

গ্রামসি মার্কসবাদবিরোধী এই কারণে যে উনি উপরিকাঠামোকে ভিত্তির চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। গ্রামসি এই কথা মানেন না যে, “ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা অনুসারে বাস্তব জীবনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনই হচ্ছে ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত নির্ধারক বস্তু”[২]। এই ধারণা থেকে মার্কসবাদকে বিশ্লেষণ না করে তিনি উপরিকাঠামোতে জোর দিয়েছেন। ফলে অর্থনীতি যে উৎপাদন সংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের কারণে বদলে যায় তা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। এই থেকে উনি শ্রেণি সমন্বয়ের লাইনে গেছেন। ফলে প্রলেতারিয়েতকে শ্রেণি হিসেবে সংগঠিত করার কাজকে হেয় করেছেন। উপরিকাঠামোকে অধিক গুরুত্ব দেয়ায় হেজিমনি ও কালচারাল হেজিমনি হলেই বিপ্লব হবে এরকম একটি অবস্থানে গেছেন। ঐ বিচ্যুতি থেকেই ইউরোকমিউনিজমের ধারণা এসেছে।

আরো পড়ুন:  সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়তে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষার গুরুত্ব

মার্কসের কথাটা তো আগের, মার্কস যখন বলেন প্রতিটা সমাজের শক্তিশালী শ্রেণিটি তার উপরিকাঠামো তৈরি করে নেয় মানে তাদের সমর্থনে শিল্প সাহিত্য ইতিহাস ধর্ম সংস্কৃতি বানিয়ে নেয়, তখন তো হেজিমনির কথাই মার্কস বলেন। বরং মার্কসের কথাটা গ্রামসিতে এসে বিকৃত হয়ে গেল, যে হেজিমনিই সব নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে হেজিমনির ভিত্তি বা সব উপরিকাঠামোর ভিত্তি যে অর্থনীতি- এই কথাটা গ্রামসিতে এসে উল্টে গেল। আসলে গ্রামসি মাথাকে উল্টিয়ে দিয়েছেন, পা কে বানিয়েছেন মাথা।

মার্কসবাদ হচ্ছে সামগ্রিক ধারণা। মানে সার্বিক এবং বিশেষ উভয় দিক থেকেই মূল্যায়ন করতে হবে। উনি বিশেষকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে ভাববাদের গাড্ডায় পড়েছেন। ইয়োসেফ ব্লক (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৭১ -১৪ ডিসেম্বর ১৯৩৬) কে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস একটি চিঠি লিখেছিলেন ১৮৯০ সালের ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর লন্ডন থেকে। সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে,

আমরা নিজেরাই আমাদের ইতিহাস সৃষ্টি করি, কিন্তু সৃষ্টি করি সর্বাগ্রে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কতকগুলি পূর্বস্থিতি ও অবস্থার মধ্যে। এদের মধ্যে অর্থনৈতিক পূর্বস্থিতি ও অবস্থাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি, এমনকি মানবমনকে আচ্ছন্ন করে থাকে যে ঐতিহ্য, তাও একটা ভূমিকা গ্রহণ করে, যদিও সে ভূমিকা নির্ধারক নয়। …
তরুণেরা যে অনেক সময় অর্থনৈতিক দিকের ওপর যতখানি উচিত তার চেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকেন, তজ্জন্য মার্কস ও আমি, আমরা নিজেরাই কিছুটা দায়ি। আমাদের প্রতিপক্ষীয়েরা অস্বীকার করতেন বলেই তাঁদের বিপরীতে অর্থনৈতিক দিকটির ওপর আমাদের জোর দিতে হয়েছিলো। পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার অন্তর্ভূক্ত অন্যান্য দিকগুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার মতো সময়, স্থান বা সুযোগ আমরা পাইনি। কিন্তু ইতিহাসের কোনো যুগকে উপস্থিত করার প্রশ্ন যখন এসেছে, অর্থাৎ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের প্রশ্ন যখন এসেছে, তখন অন্যকথা, এবং কোনো ভুল হবার সম্ভাবনা থাকেনি। দুর্ভাগ্যক্রমে, অবশ্য, প্রায়ই দেখা যায় যে, লোকে ভাবে, তারা একটি নতুন তত্ত্ব বুঝে ফেলেছে এবং ঐ তত্ত্বের প্রধান প্রধান নীতিগুলি আয়ত্ত করার সংগে সংগেই সঙ্গেই এমনকি অনেকসময় ভুলভাবে আয়ত্ত করার সংগে সংগেই, বিনা দ্বিধাসঙ্কোচে তত্ত্বটিকে প্রয়োগ করতে তারা সক্ষম। হালে যাঁরা ‘মার্কসবাদী’ হয়েছেন তাঁদের অনেককেই আমি এই সমালোচনা থেকে রেহাই দিতে পারি না, কারণ এর দৌলতেও অতি আশ্চর্য রকমের আবর্জনা সৃষ্টি হয়েছে …।[২]

এখানে প্রদত্ত চিঠিটির অংশবিশেষের শেষ বাক্যটি মনোযোগের দাবি রাখে। “হালে যাঁরা ‘মার্কসবাদী’ হয়েছেন তাঁদের অনেককেই আমি এই সমালোচনা থেকে রেহাই দিতে পারি না, কারণ এর দৌলতেও অতি আশ্চর্য রকমের আবর্জনা সৃষ্টি হয়েছে”। গ্রামসি হচ্ছেন তেমন একজন ব্যক্তি যিনি মার্কসবাদের নামে অতি আশ্চর্য রকমের আবর্জনা সৃষ্টি করেছেন।

আরো পড়ুন:  ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো প্রসঙ্গে

গ্রামশি ছিলেন মানবতাবাদী, এবং স্বৈরতন্ত্রের কঠোর সমালােচক। বিদগ্ধ ও বুদ্ধিজীবী কমিউনিস্ট হিসেবে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। আধিপত্য বা হেজিমনি সম্পর্কিত প্রত্যয়ে তিনি বলেছেন যে বিষয়টি জটিল এবং তার ছদ্মবেশী চরিত্র হলো এমন এক শ্রেণীকর্তৃত্ব যার দ্বারা সারা সমাজের গতিপ্রকৃতি অদৃশ্য ও যান্ত্রিকভাবে প্রভাবিত এবং ক্ষমতাসীন শ্রেণী কর্তৃক অধিকৃত হয়।[১]

ধ্রুপদী মার্কসবাদ অনুযায়ী উৎপাদন-শক্তি-সমূহ বিকশিত ও বিবর্ধিত হয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছয় যেখানে উৎপাদন-সম্পর্ক সেই শক্তিকে ধারণ ও বহনের পক্ষে অক্ষম হয়ে পড়ে। তখন বৈপ্লবিক পরিস্থিতি ঘনিয়ে আসে, যাবতীয় অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। গ্রামশির তত্ত্ব অনুযায়ী সেটা কার্যত ঘটে না, কারণ ভিত্তি ও উপরিকাঠামাে প্রত্যয়ের দ্বিতীয়টির অর্থাৎ সমাজ ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামাের শক্তি এতই প্রবল যে সেটা একটি শ্রেণির অবস্থানকে শক্তপােক্ত করে তােলে। সেজন্য বিপ্লবীদের কাজ হওয়া উচিত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি শিক্ষায়তন এবং চার্চ প্রভৃতির সাহায্যে নিঃশব্দে আধিপত্য বা হেজিমনি সৃষ্টি করা। তার ফলে একদিকে উপর থেকে প্রভাব বিস্তার এবং তলা থেকে শাসনব্যবস্থার ভিত্তি শিথিল করে বিপ্লবকে সুনিশ্চিত করা সহজ হবে।[১]

বিপ্লবের জন্য গ্রামসির মতে সেকারণে চাই নতুন ধরনের আধিপত্য। সেটা ক্রমপ্রসারমান হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবকে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেবে। গ্রামসি যে বিপ্লব চেয়েছিলেন সেটার লক্ষ্য দমনপীড়নকারী রাষ্ট্র নয়; যাবতীয় অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রীকরণের মধ্যে দিয়ে সর্বস্তরের মানুষকে জড়িত করে দমনপীড়নের আবশ্যকতা পরিহার করাই ছিল প্রকৃত লক্ষ্য। তিনি যে আদর্শ তুলে ধরেন সেটা একটা সুনিয়ন্ত্রিত সমাজ, নিছক একটা রাষ্ট্র নয়। সেই সমাজে দমনপীড়নের পরিবর্তে লােকের ঐকমত্য-ই হবে প্রগতির চালিকাশক্তি।[১] কিন্তু যতদিন সাম্রাজ্যবাদ ছুরি আর পরমাণু বোমা ধার দিচ্ছে, ততদিন দমনপীড়ন প্রতিরোধ করবার জন্য শান্তির ললিতবাণী কি কোনো কাজে লাগবে?

ইউরোপ মার্কসবাদের ক্ষেত্রে বিশ শতকে আর কোনো অবদান রাখতে না পারার কারণ নিহিত আছে ঐখানে যে ওরা আর মার্কসবাদের বিকাশ ঘটাতে পারেনি। আসলে জ্ঞানের প্রয়োজনটাই পড়ে নিপীড়িতদের। ইউরোপ তো বুর্জোয়া বিকাশের শুরু থেকেই নিপীড়ক, কিন্তু সামন্তবাদ বিরোধী বুর্জোয়াদের শৌর্য ছিল, সাম্রাজ্যবাদের কিছু নেই, একেবারেই পরজীবী পরপীড়ক। গ্রামসিকে মূলত সংশোধনবাদী, পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা গুরুত্ব দেয়।

আরো পড়ুন:  বুদ্ধ্যঙ্ক বা আইকিউ হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা মূল্যায়নের পরিকল্পিত মানসম্মত পরীক্ষার প্রাপ্ত ফল

এই যে ফুকো এবং গ্রামসি, এদের ভুলটা হচ্ছে এরা ভিত্তি মানে না, অংশ এবং সমগ্রের দ্বন্দ্ব মানে না। এক কথায় বস্তুবাদবিরোধী। ফলে অংবংচং বকে যায়। ফুকো তো সমগ্র ইতিহাস নিয়ে মূল্যায়নেরই বিরোধী। ইতিহাসকেও নাকি খণ্ড আকারে দেখতে হবে।

আমাদের দুঃখ এইখানে যে এঙ্গেলসের জীবিত থাকাকালে একদল তরুণ ছিলেন, যারা অর্থনীতিকে একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু গ্রামসি এবং তার পরবর্তীকালে সেই তারুণ্য কোথায়? তারুণ্য আজ গোটা ইউরোপে উগ্র ডানপন্থার বিকাশের এক প্রভাবক। একথা উল্লেখ করা মোটেই বাড়াবাড়ি হবে না যে, এই উগ্র ডানপন্থার বিকাশে গ্রামসির অবদান কম নয়।

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১০২-১০৩।

২. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ইয়োসেফ ব্লক সমীপে, ২১-২২ সেপ্টেম্বর ১৮৯০, ‘মার্কস এঙ্গেলস রচনা সঙ্কলন, দ্বিতীয় খন্ড, দ্বিতীয় অংশ’; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭২, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৭।  

Leave a Comment

error: Content is protected !!