শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ – ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) ছিলেন জীবনদরদী মহাপ্রাণ সাহিত্যস্রষ্টা ও লেখক, ঔপন্যাসিক, ও গল্পকার। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় এবং বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক।

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবিন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক হলেন তিনি; যিনি তাঁর সাহিত্য কালখণ্ড ও ভূমিখণ্ডকে স্বচ্ছন্দে অতিক্রম করে এক যুগোত্তীর্ণ মর্যাদায় অধিষ্টিত হয়ে আছেন বাঙালি পাঠকসমাজে। তাঁর কালজয়ী খ্যাতি দেশের সীমাকে অতিক্রম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করে বিদেশি পাঠকদের মনকেও জয় করেছেন। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমন একটি নতুন পথ ধরে অগ্রসর হয়েছেন— যা বাংলা কথাসাহিত্যের পরিধিকে প্রসারিত করে তার মধ্যে এনেছে এক অদৃষ্টপূর্ব বৈচিত্র্য। সংবেদনশীল হৃদয়, ব্যাপক জীবনজিজ্ঞাসা, প্রখর পর্যাবেক্ষনশক্তি সংস্কারমুক্ত স্বাধীন মনোভঙ্গি— প্রভৃতির গুণে শরৎসাহিত্য লাভ করেছে এক অনন্যসাধারণ বিশিষ্টতা— যা পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত করেছে।

জন্ম ও শৈশব:

অখণ্ড ভারতবর্ষের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে  ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর (৩১ ভাদ্র ১২৮৩ বঙ্গাব্দ) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শরৎচন্দ্রের পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়, মা ভুবনমোহিনী দেবী। সাত ভাইবোনের মধ্যে শরৎচন্দ্র ছিলেন দ্বিতীয়, ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। বড়বোন অনিলা দেবী ও পরের দুই ভাই জন্মের পরই মারা যায়। এরপর দুই ভাই প্রভাসচন্দ্র ও প্রকাশচন্দ্র ছোটবোন সুশীলা দেবী। শরৎচন্দ্রের পৈতৃক বাসভূমি ২৪ পরগনা জেলায় কাচড়াপাড়ার মামুদপুর গ্রাম। দেবানন্দপুর পিতার মাতুলালয়। পিতা মোতিলাল চট্টোপাধ্যায় নির্ভীক ও অত্যন্ত স্বাধীন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ১৮৯৫ সালে নভেম্বরে শরৎচন্দ্রের মা ভুবনমোহিনী দেবী পরলোকগমন করেন।

শরৎচন্দ্র মিস্ত্রীপল্লীতে থাকার সময় তার বাসার নিচেই চক্রবর্তী উপাধিধারী এক মিস্ত্রি থাকত। ঐ মিস্ত্রীর শান্তি নামে একটি কন্যা ছিল। চক্রবর্তী এক প্রৌঢ় ও মাতাল মিস্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কন্যার বিয়ের ব্যবস্থা করে। চক্রবর্তীর কন্যার কিন্তু এই বিয়েতে ঘোর আপত্তি ছিল; সে কারণে চক্রবর্তীর কন্যা শান্তি দেবী একদিন তার এই অবস্থা থেকে রক্ষা করবার জন্য শরৎচন্দ্রের পায়ে পড়ে তাকে অনুরোধ করে। তখন  শরৎচন্দ্র  বাধ্য হয়ে নিজেই তাকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের এক পুত্র সন্তানও জন্ম নেয়।  রেঙ্গুনে অবস্থানকালে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে শান্তি দেবী এবং শিশুপুত্র উভয়ের  মৃত্যু হয়। স্ত্রী ও পুত্রকে হারিয়ে শরৎচন্দ্র তখন গভীর শোকাহত হয়ে পড়।

আরো পড়ুন:  অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও আলোকচিত্রী

শান্তি দেবীর মৃত্যুর অনেকদিন পরে শরৎচন্দ্র ঐ রেঙ্গুনেই দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। বিয়ের আগ পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের এই দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ছিল মোক্ষদা। বিয়ের পর শরৎচন্দ্র তাঁর নাম বদলে হিরন্ময়ী নাম দেন। বিয়ের সময় হিরণয়ী দেবীর বয়স ছিল ১৪। শরৎচন্দ্র ও হিরন্ময়ী দেবীর কোনো সন্তান ছিল না। তারপরেও শরৎচন্দ্র তাঁকে নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুখে শান্তিতেই জীবনপাত করেছেন।

শিক্ষাজীবন:

১৮৮৬ সালে দেবানন্দপুরের পাঠশালায় ও গ্রামের বাংলা স্কুলে শরৎচন্দ্রের পড়ালেখার শুরু। ১৮৮৬ সালে পিতার চাকরিপ্রাপ্তি এবং কর্মস্থল ডিহরিতে গমন। এ বছর শরৎচন্দ্রের মাতুলালয়ে আগমন ও দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয়ে ভর্তি। ১৮৮৭ সালে ভাগলপুরের দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয় থেকে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ ও ভাগলপুর জেলা স্কুলে সেকালের সেভেন্থ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৮৮৮ সালে তিনি স্কুলে ডবল প্রমোশন লাভ করেন। ১৮৮৯ সালে পিতার চাকরি শেষ এবং পিতা-মাতার সঙ্গে পুনরায় দেবানন্দপুরে আগমন। এই বছরেই হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হন।

১৮৯২ সালে আর্থিক অভাব অনটনের জন্য এক বছর পড়া বন্ধ। ১৮৯৩ সালে পিতা-মাতার সঙ্গে পুনরায় ভাগলপুরে ফেরা এবং এখানকার টি এন জুবিলি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি। ১৮৯৪ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস। টি এন কলেজে এফ-এ ক্লাসে ভর্তি। ১৮৯৬ সালে মাতুলালয় ছেড়ে পিতার সঙ্গে ভাগলপুরের খঞ্জরপুর পল্লিতে বসবাস শুরু। দেনার দায়ে পিতা কর্তৃক দেবানন্দপুরের বসতবাড়ি বিক্রয়। অর্থাভাবে কলেজের পড়াশুনা ত্যাগ, এবং অতঃপর এই মহান সাহিত্যিকের একাডেমিক পড়াশুনারও সমাপ্তি ঘটে।

কর্মজীবন:

বিহারের গোড্ডায় রাজ বনালি এস্টেটে চাকুরি অর্জন (১৯০০)। চাকুরি ছেড়ে কিছুদিন সাঁওতাল পরগনায় সেটেলমেন্টের কাজে যোগদান। ১৯০৫ রেলওয়ের অডিট বিভাগে চাকুরি। পরে পিডব্লিউডি-তে যোগদান। আড়াই মাস পরে চাকরিচ্যুত হলে ন্যয়ঙ্গলাবিনে ধানের ব্যবসা। ১৯০৬ মাসে মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এসে পুনরায় পিডব্লিউডি-তে চাকুরিগ্রহণ। ১৯১৬ সালে চাকুরি ছেড়ে কলকাতা প্রত্যাবর্তন।

আরো পড়ুন:  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইয়ের পথের পথিকদের আলোকবর্তিকা

পত্রিকা সম্পাদনা:

১৯১৪ সালের জুনে ‘যমুনা’র অন্যতম সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯১৫ সালে স্বেচ্ছায় ‘যমুনা’র সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন তিনি।

প্রকাশিত গ্রন্থ:

উপন্যাস

বড়দিদি (সেপ্টেম্বর ১৯১৩); বিরাজ বৌ (মে ১৯১৪); পণ্ডিতমশাই (সেপ্টেম্বর ১৯১৪); পল্লী-সমাজ (জানুয়ারি ১৯১৬); চন্দ্রনাথ (মার্চ ১৯১৬); শ্রীকান্ত ১ম পর্ব (ফেব্রুয়ারি ১৯১৭); দেবদাস (জুন ১৯১৭); চরিত্রহীন (নভেম্বর ১৯১৭); দত্তা (সেপ্টেম্বর ১৯১৮); শ্রীকান্ত ২য় পর্ব (সেপ্টেম্বর ১৯১৮); গৃহদাহ (মার্চ ১৯২০); বামুনের মেয়ে (অক্টোবর ১৯২০); দেনা-পাওনা (আগস্ট ১৯২৩); নব-বিধান (অক্টোবর ১৯২৪); পথের দাবী (আগস্ট ১৯২৬); শ্রীকান্ত ৩য় পর্ব (এপ্রিল ১৯২৭); শেষ প্রশ্ন (মে ১৯৩১); শ্রীকান্ত ৪র্থ পর্ব (মার্চ ১৯৩৩); বিপ্রদাস (ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫) এবং মৃত্যুর পরে প্রকাশিত-শুভদা (জুন ১৯৩৮); শেষের পরিচয় (১৯৩৯)।

ছোটগল্প:

মেজদিদি (গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স, কলকাতা, ডিসেম্বর ১৯১৫); নিষ্কৃতি (গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স, কলকাতা, জুলাই ১৯১৭); স্বামী (গুরুদাস। চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স, কলকাতা, ফেব্রুয়ারি ১৯১৮); ছবি (গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স, কলকাতা, জানুয়ারি ১৯২০); হরিলক্ষ্মী (গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স, কলকাতা, মার্চ ১৯২৬); অনুরাধা সতী ও পরেশ (?)

সাহিত্য-বৈশিষ্ট্য:

শরৎচন্দ্রের সমস্ত উপন্যাস ও ছোট গল্পগুলিকে প্রধানত পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তত্ত্বমূলক—এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করলেও তার অধিকাংশ উপন্যাসের কেন্দ্রভূমিতে রয়েছে বাঙালির সমাজ সম্পর্কে এক বিরাট জিজ্ঞাসা এবং বাঙালির মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ জীবনের রূপায়ণ। সমাজের বাস্তব অবস্থা নরনারীর জীবনভঙ্গিমা ও জীবনবোধকে নিয়ন্ত্রিত করে তাদের মানসলোকে যে সূক্ষ্ম জটিল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, শরৎসাহিত্যে আমরা পাই তারই সার্থক চিত্র। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের দুঃখ-বেদনার এত বড় কাব্যকার ইতঃপূর্বে দেখিনি আমরা। মূঢ়তায় আচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থার নিষ্ঠুর শাসনে লাঞ্ছিত নর-নারীর অশ্রুসিক্ত জীবনকথা অবলম্বন করে মানবদরদী শরৎচন্দ্র গদ্যবাহিত যে কতকগুলি উৎকৃষ্ট ট্র্যাজেডি রচনা করেছেন তাতে বাংলা সমাজের অতিবিশ্বস্ত ও বহুচিত্রিত এক আলেখ্য উন্মোচিত হয়েছে আমাদের সামনে।

আরো পড়ুন:  ধনঞ্জয় রায় উত্তরবঙ্গ বিশ্লেষক একজন জনপ্রিয় লেখক

পুরস্কার ও সম্মাননা:

প্রথম মুদ্রিত রচনা ‘মন্দির’ গল্পটির জন্য শরৎচন্দ্র কুন্তলীন পুরস্কার লাভ করেন ১৩০৯ সনে। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। এর আগে ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী সুবর্ণপদক’ উপাধি প্রদান করে। এসব ছাড়া জীবদ্দশাতেই তাঁকে দেশবাসী ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী, ‘সাহিত্য সম্রাট’ প্রভৃতি আখ্যায় বিভূষিত করেছে। বৈদ্যবাটী যুব সংঘ, শিবপুর সাহিত্য সংসদ, যশােহর সাহিত্য সংঘ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এবং সাধারণভাবে দেশবাসীর পক্ষ থেকে একাধিকবার তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

মৃত্যু:

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি (২ মাঘ, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) রবিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি পরলােকগমন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৬১ বছর ৪ মাস।

তথ্যসূত্র:

১. ভাষাপ্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ট গল্পমালা , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রেষ্ট গল্প; ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ  ফেব্রুয়ারি, ২০১৬; পৃ: ২৩০-২৩২।

Leave a Comment

error: Content is protected !!