প্রকৃতি আমাদের সুস্থতার জন্য অগণিত ওষুধি উদ্ভিদের ভাণ্ডার সাজিয়ে রেখেছে, যার মধ্যে ‘বচ’ (Sweet Flag) অন্যতম। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান—সবখানেই এই বহুবর্ষজীবী বীরৎ উদ্ভিদের জয়জয়কার। এটি কেবল একটি সাধারণ উদ্ভিদ নয়, বরং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, শ্বাসতন্ত্রের সুরক্ষা এবং স্নায়বিক দুর্বলতা দূরীকরণে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রাকৃতিক সমাধান। প্রায় আড়াইশো বছর আগে এদেশের মাটিতে স্থান করে নেওয়া এই উদ্ভিদটি তার বৈচিত্র্যময় নাম এবং জাদুকরী ওষুধি গুণের কারণে লোকজ চিকিৎসায় এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আজকের নিবন্ধে আমরা বচ-এর গঠন, এর বিস্ময়কর স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং বাজারে প্রচলিত ভেজালের ভিড়ে খাঁটি বচ চিনে নেওয়ার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বিবরণ
উদ্ভিদ জগতের বৈচিত্র্যের শেষ নেই। আজকে আমরা এমন এক বিশেষ বহুবর্ষজীবী বীরৎ বচ নিয়ে আলোচনা করব। যা তার গঠন এবং বৈশিষ্ট্যে অনন্য। বাগানপ্রেমী বা উদ্ভিদবিদ—সবার জন্যই এই উদ্ভিদের গঠনতত্ত্ব বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এই উদ্ভিদটি সাধারণত ৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কাণ্ডটি মাটির নিচে মূলাকার অবস্থায় থাকে, যা প্রায় ১-২ সেন্টিমিটার প্রশস্ত। কাণ্ডটি বেশ ঋজু এবং মসৃণ, যা উদ্ভিদটিকে একটি দৃঢ় ভিত্তি দান করে। এই গাছটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর পাতা। পাতাগুলো অসিফলাকৃতি বা রৈখিক হয়ে থাকে এবং ওপরের দিকের শাখায় স্তবকে সজ্জিত থাকে। পাতার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সাধারণত ৫৫-৮০ x ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। পাতার মাঝখানের শিরা বা মধ্যশিরাটি বেশ সুস্পষ্ট, যা এর সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। উদ্ভিদটিতে হালকা হলুদ রঙের স্পেডিক্স পুষ্পবিন্যাস দেখা যায়, যার আকার ৫-৬.৫ x ১.০-১.৫ সেন্টিমিটার। এর পুষ্পদন্ড অনেকটা পাতার মতোই দেখতে। ফুলের সংখ্যা অসংখ্য এবং এগুলো বেশ ঘনভাবে বিন্যস্ত থাকে। এতে ৬টি পুংকেশর থাকে যার পুংদন্ড বেশ দীর্ঘ। পরাগধানীগুলো গৌর বর্ণের হয়ে থাকে। এর গর্ভাশয় বেলনাকার এবং ষটকোনী আকৃতির। এটি সাধারণত ২-৩ প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট হয় এবং প্রতি প্রকোষ্ঠে ৭-১০টি ডিম্বক থাকে। এই উদ্ভিদের ফল মূলত ‘বেরি’ জাতীয়। এর বীজগুলো আকৃতিতে কোণাকৃতি এবং আকারে বেশ ক্ষুদ্র, প্রায় ২ মিলিমিটারের মতো। ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n =৩৬
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার
এই বিশেষ বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদটি তার বেঁচে থাকার জন্য মূলত উঁচু স্থানের উন্মুক্ত জলাভূমিকে বেছে নেয়, যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং পানির সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকে। প্রকৃতির প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নির্দিষ্ট উচ্চতায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এই উদ্ভিদটির জীবনচক্র অত্যন্ত চমৎকার; বিশেষ করে এর প্রজনন প্রক্রিয়া উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে কৌতূহলোদ্দীপক। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে, মূলত এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত এই উদ্ভিদে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন ফুল এবং ফলের সঞ্চার ঘটে। এই সময়েই উদ্ভিদটি তার বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর বংশ বিস্তারের কৌশলটি দ্বিমুখী—এটি যেমন সুস্থ ও সবল বীজের মাধ্যমে নতুন চারার জন্ম দিতে সক্ষম, তেমনি মাটির নিচে থাকা এর সুগঠিত কন্দের মাধ্যমেও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রজননের এই বৈচিত্র্যময় পদ্ধতিই একে দীর্ঘজীবী করে তোলে এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার বাড়তি শক্তি জোগায়।
ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও বাংলাদেশে চাষাবাদ
এই অনন্য উদ্ভিদটির বৈশ্বিক উপস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়। এটি উত্তর ও মধ্য আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। মূলত বিভিন্ন জলবায়ু ও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে এটি বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। তবে আমাদের স্থানীয় প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভিদের গুরুত্ব আরও বেশি। বাংলাদেশে মূলত রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চলগুলো থেকে এই উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে এই নির্দিষ্ট এলাকাগুলো থেকে সংগৃহীত চারা ও কন্দ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন শৌখিন ও বাণিজ্যিক বাগানে অত্যন্ত যত্নসহকারে এর চাষাবাদ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক আবাসস্থলের বাইরেও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগানপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত হয়ে উঠছে।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বচ প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অরণ্যহীন অবস্থা ও বাসস্থানের বিপর্যয়ের জন্য সংকটের কারণ দেখা যায় এবং বাংলাদেশে এটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বচ কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যানে চাষাবাদ চলছে। উল্লেখ্য মিরপুরের জাতীয় হার্বেরিয়াম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিএসআইআর গবেষণাগারের উদ্যানসমূহে যত্নসহকারে জন্মানো হয়। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে বাসস্থানের বাইরে সংরক্ষণ প্রয়োজন।[১]
প্রাচীন শাস্ত্র ও আয়ুর্বেদে বচ-এর ঐতিহাসিক প্রয়োগ
বচ বা বীরৎ জাতীয় এই ভেষজটির ব্যবহার ও কার্যকারিতা সম্পর্কে আমাদের প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। প্রখ্যাত চরক সংহিতায় এই উদ্ভিদকে শিরো বিরেচন, বমন প্রক্রিয়া এবং পক্বাশয় ও বাতরোগের মহৌষধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সুশ্রুত সংহিতায় একে দীর্ঘায়ু ও প্রখর মেধা লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সেখানে বলা হয়েছে যে, ‘কুটী প্রবেশিক’ নিয়মে ব্রাহ্মীঘৃতের সাথে আমলকী পরিমাণ বচপিণ্ড সেবন করে দুধ ও ঘি সহযোগে আহার গ্রহণ করলে শতায়ু হওয়া সম্ভব। মহর্ষি বাগভট বচকে অরোচক বা খাবারের প্রতি অনীহা দূর করার একটি অপরিহার্য ভেষজ হিসেবে গণ্য করেছেন। চক্রদত্তের বর্ণনা অনুসারে, উন্মাদ বা মানসিক অস্থিরতায় বচের রস বা চূর্ণের সাথে কুড়চূর্ণ ও মধু মিশিয়ে সেবন করলে অভূতপূর্ব সুফল পাওয়া যায়। এছাড়া মৃগী বা অপস্মর রোগের চিকিৎসায় দুগ্ধান্ন ও মধুসহ এর ব্যবহার সুপ্রসিদ্ধ। বৃদ্ধি বা হার্নিয়া রোগের অস্বস্তি কমাতে বচ ও সরিষার প্রলেপ যেমন কার্যকর, তেমনি ভাবপ্রকাশ অনুযায়ী মূত্ররোধক সমস্যায় কাঁচা দুধ ও ঠাণ্ডা পানির সাথে বচ চূর্ণ সেবন করলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও ফর্মুলারিতে বচ-এর গুরুত্ব
ঐতিহাসিক শাস্ত্রের পাশাপাশি আধুনিক আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বচ একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারী ১৯৯২ অনুযায়ী, প্রায় ৬৫টি ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ তৈরিতে এই উদ্ভিদের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘দারুষটক লেপ’, যা পেট ফাঁপা ও তীব্র শূল ব্যথা নিরাময়ে কার্যকর। এছাড়া বীর্যস্তম্ভক ও বাজীকরণ হিসেবে ‘নাগবল্যদ্য চূর্ণ’, স্মৃতিশক্তি ও কণ্ঠস্বর বৃদ্ধিতে ‘ব্রাহ্মীঘৃত’ এবং বিভিন্ন স্নায়বিক জটিলতা বা সূতিকা প্রশমনে ‘বলা তৈল’ অত্যন্ত পরিচিত। বিশেষ করে ‘অশ্বগন্ধারিষ্ট’ তৈরিতে বচের ব্যবহার মৃগী, অনিদ্রা, উন্মাদ ও বাতরোগের মতো জটিল সমস্যায় অনন্য সমাধান দেয়। একইভাবে, বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানী ফর্মুলারী ১৯৯৩-এ নয়টি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উপাদান হিসেবে বচের উল্লেখ রয়েছে। ইউনানী চিকিৎসায় সাদা বচকে ‘ওয়াজ তুর্কী’ বলা হয় এবং মজার বিষয় হলো, এই পদ্ধতির একটি বিশেষ ওষুধে কেবল সাদা বচ ও মধু বা চিনির মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়, যেখানে অন্য কোনো খনিজ বা উদ্ভিদ মেশানো হয় না। এটি মূলত স্নায়ুশক্তির বিকাশ এবং স্মৃতিবর্ধক হিসেবে চমৎকার কাজ করে। যদিও হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতিতে বচের পূর্ণাঙ্গ ‘প্রুভিং’ এখনও সম্পন্ন হয়নি, তবে এর ‘মাদার টিংচার’ ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে।[২]
ভেষজ গুণাগুণ ও অনন্য ব্যবহারিক উপযোগিতা
প্রকৃতির এই অনন্য দান বচ বা বীরৎ জাতীয় উদ্ভিদটি তার অসাধারণ ঔষধি গুণের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই সমাদৃত। যদিও এর কন্দের স্বাদ কিছুটা কটু, তিতা এবং তীব্র উত্তেজক প্রকৃতির, তবুও এর বহুমুখী স্বাস্থ্য উপকারিতা অনস্বীকার্য। এটি মূলত বমনোদ্রেককারী ও রেচক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি মূত্রবর্ধক এবং বায়ুরোগ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর। শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় এর ব্যবহার অতুলনীয়; বিশেষ করে কাশি দূর করে ফুসফুস পরিষ্কার করতে এবং কণ্ঠস্বরের মাধুর্য বৃদ্ধিতে এটি দারুণ কাজ করে। যারা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষুধা মন্দায় ভুগছেন, তাদের জন্য এটি একটি প্রাকৃতিক সমাধান। এছাড়া মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধক হিসেবে এবং মুখ ও গলার বিভিন্ন সংক্রমণ রোধে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত।
এই উদ্ভিদের উপকারিতা এখানেই শেষ নয়; এটি উদরের ব্যথা, পেট ফাঁপা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, এমনকি মৃগী রোগের মতো জটিল সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়। আধুনিক ও লোকজ চিকিৎসায় শ্বাসনালীর প্রদাহ, হাঁপানী, বিভিন্ন ধরণের টিউমার, ইঁদুরের কামড়ের বিষক্রিয়া এবং এমনকি বৃক্ক বা যকৃতের ব্যথা উপশমেও এটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এছাড়া শ্বেতীরোগ, দাঁতের ব্যথা, সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা এবং শিশুদের পুরনো উদরাময় সারাতে এর কন্দ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহারের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্থানীয়রা গলা পরিষ্কারের জন্য এর কন্দ চিবিয়ে থাকেন এবং চীনা চিকিৎসাবিদদের মতে এর মূলে ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদানও বিদ্যমান।
উদ্ভিদতাত্ত্বিকদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমাদের এই জনপদে বচ বিরুৎ-এর আগমন খুব বেশি পুরনো নয়; ধারণা করা হয় প্রায় আড়াইশো বছর আগে এটি এদেশের মাটিতে প্রথম স্থান করে নেয়। ঋতুচক্রের সাথে তাল মিলিয়ে এই উদ্ভিদের জীবনচক্র আবর্তিত হয়—মূলত বর্ষার আগমনে এর ফুল ফোটা শুরু হয় এবং বর্ষা বিদায়ের প্রাক্কালে এটি ফলে সুশোভিত হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় এই উদ্ভিদের নামের এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে; একে শুধু বচ নয়, বরং বচা, উগ্রগন্ধা, ষড়গ্রন্থা, গোলোমী, শত পর্বিকা, ক্ষুদ্রপত্রী, মঙ্গল্যা, জটিলা, উগ্রা ও লোমশা নামেও ডাকা হয়। এর ভেষজ গুণের কারণে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন হিন্দিতে এটি ‘বচ’, গুজরাটি ও মারাঠি ভাষায় ‘ভেখন্দ’, মালয় ভাষায় ‘ভায়াম্প’, তামিল ভাষায় ‘ভাষায়ু’ এবং আসামী ভাষায় এটি ‘বচ’ নামেই সমাদৃত। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরবিতে ‘বজ্জ’, ফারসিতে ‘অগরে তুর্কী’ এবং ইউনানী চিকিৎসায় এটি ‘ওয়াজ তুর্কী’ হিসেবে স্বীকৃত। ইংরেজিভাষী অঞ্চলে এটি ‘Sweet root’ বা ‘Sweet flag’ নামে বেশ জনপ্রিয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই উদ্ভিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর রাইজোম বা কন্দমূল, যা থেকে নানাবিধ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করা হয়।[১]
কাশি: দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা লোকজ ও পরীক্ষিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে দেখা গেছে, বচ শুধু বিভিন্ন ওষুধের উপাদান হিসেবেই নয়, বরং একক ভেষজ হিসেবেও অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের সাধারণ কিন্তু বিরক্তিকর সমস্যা যেমন—অবিরাম কাশি, গলায় খুশখুশানি বা তীব্র গলা ব্যথার সমাধানে এটি দারুণ কার্যকর। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত ফাইটোলক্কা (Phytolacca), রিউমেক্স (Rumex) কিংবা স্টিক্টা (Sticta)-র মতো ওষুধের বিকল্প এবং প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে বচ ব্যবহার করা হয়। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই গলার অস্বস্তি দূর করতে এবং স্বরযন্ত্রকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এর একক প্রয়োগ অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে যুগ যুগ ধরে প্রমাণিত।
স্নায়বিক শক্তি ও পরিপাকতন্ত্রের সুরক্ষায়: আধুনিক ও লোকজ চিকিৎসায় বচ-এর গুরুত্ব অপরিসীম, বিশেষ করে স্নায়ুসমূহের কার্যকারিতা পুনরুজ্জীবিত করতে এটি বিকল্পহীন। স্নায়বিক দুর্বলতা দূরীকরণে প্রচলিত হাইপেরিকাম (Hypericum) বা এনাকার্ডিয়াম (Anacardium)-এর মতো ওষুধের প্রাকৃতিক ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে বচ অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। শুধু স্নায়ুতন্ত্রই নয়, পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা নিরাময়েও এর ভূমিকা অনন্য। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অজীর্ণতা বা বদহজমজনিত কারণে যদি পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি দেখা দেয়, তবে বচ থেকে প্রস্তুতকৃত শক্তিকৃত ওষুধ (Potentized medicine) জাদুর মতো কাজ করতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে শিশুদের উদরাময় ও পেটের সমস্যা সমাধানে বচ দীর্ঘকাল ধরেই এক নির্ভরযোগ্য ভেষজ হিসেবে স্বীকৃত।
বাজারের ভেজাল ও খাঁটি বচ চেনার উপায়:
বচ-এর অতি জনপ্রিয়তা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার সুযোগ নিয়ে বর্তমানে বাজারে এর সরবারহে এক ধরণের অসাধু চক্রের আনাগোনা বেড়েছে। বাণিজ্যিকভাবে Acorus calamus বা কালামাস নামে যা বিক্রি হয়, তাতে প্রায়ই Alpittia galanga (হৈমবতী বচ) এমনকি অত্যন্ত বিষাক্ত Aconituan spp-এর রাইজোম বা কন্দ মিশিয়ে দেওয়া হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের বাজারে এই ধরণের বিপজ্জনক মিশ্রণ হরহামেশাই বিক্রি হতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, যারা গুঁড়া বা চূর্ণ বচ বাজারজাত করেন, তারা অনেক সময় সিলিসিয়াস মাটি এবং Althaea officinalis-এর শিকড়ের পাউডার মিশিয়ে এর ওজন ও পরিমাণ বাড়িয়ে দেন।
এতসব ভেজালের ভিড়ে আসল বচ চিনে নেওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়। খাঁটি বচের কন্দ ক্রয়ের সময় কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, আসল বচের রাইজোম বা কন্দ হবে:
- হালকা সুগন্ধযুক্ত: এটি খুব বেশি তীব্র নয়, বরং একটি স্নিগ্ধ ঘ্রাণ ছড়াবে।
- গঠন: এটি বহু ফেকুড়ি বা শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট হবে।
- আকৃতি: মূলগুলো হবে লম্বা, কিছুটা চ্যাপটা এবং স্পষ্ট গিঁটযুক্ত বা গাঁটবহুল।[২]
আরো পড়ুন:
- কেতুরী হলদি দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ায় জন্মানো কন্দ প্রজাতি
- শঠি বা শটি কন্দের নানাবিধি ভেষজ গুণাগুণের বিবরণ
- সটি বা ফইল্লা দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বিরুৎ
- হলুদ বাংলাদেশে জন্মানো জনপ্রিয় ও ভেষজ গুণসম্পন্ন মসলা
- কালা হলদি পাহাড়িঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বিরুৎ
- আমাদা বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় ভেষজ কন্দজ প্রজাতি
- কচু বাংলাদেশে জন্মানো জনপ্রিয় ও সহজলভ্য ভেষজ সবজি
- গাং কনুর বাংলাদেশে জন্মানো বহুবর্ষজীবী কন্দ বীরুৎ
- বিষ কনুর বাংলাদেশে পাহাড়ীঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বিরুৎ
- দেশি কনুর ভেষজ গুণসম্পন্ন বাহারি বিরুৎ প্রজাতি
- লম্বা ফানকচু দক্ষিণ পুর্ব এশিয়ার অরণ্য বিরুৎ
- চীনা বিষকচু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভেষজ বিরুৎ
- খাড়া বিষকচু বাংলাদেশের ঝোপ-ঝাড়ে জন্মানো সংকটাপন্ন বিরুৎ
- বচ-এর বিস্ময়কর ওষুধি গুণাগুণ: স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ও রোগ নিরাময়ে প্রকৃতির এক অনন্য দান
- ওল কচু দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষজীবী ভেষজ কন্দজাতীয় গুল্ম
- কলাবতী জলাশয়ের পাশে জন্মানো কন্দজাতীয় বিরুৎ
- বিট লোহা আর ফসফরাস সমৃদ্ধ ভেষজ গুণ সম্পন্ন সবজি
- মিষ্টি আলু নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে লতান বীরুৎ
- রসুন সারা দুনিয়ায় ব্যবহৃত জনপ্রিয় সবজি মসলা
- আদা হচ্ছে জিঞ্জিবার গণের ছোট কন্দজ ঔষধি বীরুৎ
- কেও বা কেঁউ গাছ: প্রকৃতিতে এক দৃষ্টিনন্দন ভেষজ ভাণ্ডার ও তার বহুমুখী ব্যবহার
- মুলা বা মুলোর সবজির পনেরটি ভেষজ উপকারিতা
- ওল বা ওলকচু খাওয়ার ষোলটি ভেষজ গুণাগুণ ও উপকারিতা
তথ্যসূত্র:
১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ২১-২২। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. ড. সামসুদ্দিন আহমদ: ওষুধি উদ্ভিদ (পরিচিতি, উপযোগিতা ও ব্যবহার), দিব্যপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা, জানুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা, ৫০-৫৩।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Michael Rivera
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।