পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম: বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রজাতির অজানা তথ্য

বাংলাদেশের কচ্ছপ প্রজাতির তালিকায় মোট ২৯ ধরনের কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় একটি জলজ প্রাণী হলো পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম (Asiatic Softshell Turtle)। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) অনুযায়ী, মহাবিপন্ন এই প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম Amyda cartilaginea

নাম ও পরিচিতি:

পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম আমাদের দেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রাণী। আন্তর্জাতিকভাবে এটি Asiatic Softshell Turtle নামে পরিচিত। এর মূল বৈজ্ঞানিক নাম Amyda cartilaginea। তবে বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞানীদের দেওয়া বেশ কিছু সমনাম বা সিনোনিমও রয়েছে। যেমন: Testudo cartilaginea, Testudo membranacea, Testudo boddaerti, Amyda javanica, এবং Trionyx javanicus

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস (Taxonomy):

ধাপশ্রেণিবিন্যাস (বাংলা ও ইংরেজি)
শ্রেণি (Class)Reptilia (সরীসৃপ)
পরিবার (Family)Trionychidae (নরম খোলসের কাছিম)
গণ (Genus)Amyda
প্রজাতি (Species)Amyda cartilaginea

পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম-এর বর্ণনা:

  • আকার ও ওজন: পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমের পিঠের খোলস (Carapace) সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার (২৭.৬ থেকে ৩১.৫ ইঞ্চি) লম্বা হয়। এদের গড় ওজন ১৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে কিছু অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, এরা সর্বোচ্চ ১০৫ কেজি পর্যন্ত ওজনেরও হতে পারে।
  • খোলসের গঠন ও রঙ: বয়সভেদে এদের খোলসের টেক্সচার ও রঙে পরিবর্তন আসে। তরুণ কাছিমের খোলস বেশ অমসৃণ থাকে, যা বয়সের সাথে সাথে নরম ও চামড়ার মতো (Leathery) রূপ নেয়। পূর্ণবয়স্ক কাছিমের খোলসের রঙ হালকা জলপাই বা সবুজ-বাদামি হয়। অন্যদিকে, ছোটদের খোলস গাঢ় বাদামি বা কালো রঙের হয়ে থাকে এবং তাতে কিছু হলুদ ও কালো ফোঁটা দেখা যায়, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে মুছে যায়।
  • পুরুষ ও স্ত্রী কাছিমের পার্থক্য (Sexual Dimorphism): পুরুষ কাছিমের পেটের অংশ (Plastron) সাদা এবং স্ত্রী কাছিমের পেটের অংশ ধূসর রঙের হয়। এছাড়া স্ত্রী কাছিমের তুলনায় পুরুষ কাছিমের লেজ বেশি লম্বা ও মোটা হয়ে থাকে।
  • মাথা ও বিশেষ অভিযোজন: এদের মাথা কালো বা বাদামি রঙের হয়, যাতে হলুদ রঙের ডট বা লম্বাটে দাগ দেখা যায়। এদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এদের লম্বাটে নাক বা স্নআউট (Snout)। কাদার নিচে লুকিয়ে থাকার সময় এই লম্বা নাক এদের সহজে শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
  • পানির নিচে থাকার ক্ষমতা: এরা অত্যন্ত নমনীয় এবং এদের গলায় বিশেষ এক ধরণের অভিযোজন (Pharyngeal Breathing) রয়েছে। এর ফলে এরা পানির নিচেও দীর্ঘক্ষণ অক্সিজেন গ্রহণ করে ডুবে থাকতে পারে।
  • পা ও লেজ: এদের গলায় স্থায়ী কিছু হলুদ বা কালো রঙের গুটি (Tubercles) থাকে। এদের পাগুলো বেশ চওড়া ও চ্যাপ্টা হয়, যা দেখতে অনেকটা নৌকার বৈঠার মতো। এই পায়ের সাহায্যে এরা খুব দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে।

আবাসস্থল ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি:

  • পছন্দসই পরিবেশ ও বাসস্থান: পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম মূলত ক্রান্তীয় অঞ্চল (Tropical Regions) এবং মিষ্টি পানির পরিবেশ পছন্দ করে। এরা রেইনফরেস্টের স্থলভূমি ছাড়াও বিভিন্ন জলাশয় যেমন— হ্রদ, পুকুর, খাল এবং নিচু এলাকার পাহাড়ি ছড়া বা স্রোতস্বিনী নদীতে বাস করে।
  • জলাভূমির প্রতি আকর্ষণ: এই কাছিমগুলো জলাভূমি বা ওয়েটল্যান্ডস (Wetlands) বেশি পছন্দ করে। বিশেষ করে নিচু অঞ্চলের বিল, প্লাবনভূমি, কাদাভর্তি বড় নদী এবং হাওর-বাঁওড়ে এদের প্রচুর দেখা মেলে।
  • ভৌগোলিক বিস্তৃতি (যেসব দেশে পাওয়া যায়): এশিয়ার একটি বড় অঞ্চল জুড়ে এই কাছিমের বিচরণ রয়েছে। নিচে এদের আবাসভূমির তালিকা দেওয়া হলো:
    • দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: বাংলাদেশ, ভারত, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম।
    • দ্বীপ ও দ্বীপরাষ্ট্র: ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, বোর্নিও, সাবাহ এবং সারাওয়াক।

খাদ্যভাস ও শিকার পদ্ধতি:

  • সর্বভুক স্বভাব (Omnivore): পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম মূলত একটি সর্বভুক প্রাণী। এরা সুযোগ বুঝে উদ্ভিদ এবং অন্য যেকোনো প্রাণী— উভয়ই খাবার হিসেবে গ্রহণ করে।
  • শিকারের অনন্য কৌশল: এদের গলায় ফুলকার মতো বিশেষ এক ধরণের অঙ্গ থাকায় এরা পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ শ্বাস না নিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে। এই ক্ষমতার কারণে এরা শিকারের খুব কাছাকাছি গিয়ে অতর্কিতে নিখুঁত আক্রমণ (Sneak Attack) করতে পারে।
  • প্রধান প্রিয় খাবার: এদের প্রধান খাদ্য তালিকায় রয়েছে কাঁকড়া, মাছ, জলজ পোকামাকড়, কেঁচো, ব্যাঙ বা উভচর প্রাণী, ক্রাস্টেসিয়ান (খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী) এবং পাখির ডিম। এমনকি এরা মাঝেমধ্যে মৃত পাখির মাংস বা পচা দেহাবশেষও (Carcass) খেয়ে থাকে।
  • উদ্ভিদজাত খাবার: যখন এরা আমিষ জাতীয় খাবার পায় না, তখন বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন ফল, বেরি, বাদাম এবং উদ্ভিদের বীজ খেয়ে থাকে। বিশেষ করে জলাভূমির উদ্ভিদের বীজ এবং রবার গাছের বীজ এদের বেশ প্রিয়।
  • খাদ্যভ্যাসের পরিবর্তন ও সময়: বাসস্থান এবং পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের খাদ্য তালিকায় কিছুটা বদল আসে। এরা মূলত নিশাচর প্রাণী, তাই শিকার এবং খাবারের সন্ধান করার মূল কাজটি এরা রাতের অন্ধকারেই সেরে নেয়।

প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি:

  • বহুগামী প্রজনন স্বভাব (Polygynangrous): এই কাছিমগুলো বহুগামী হয়ে থাকে। অর্থাৎ, একটি পুরুষ কাছিম একাধিক স্ত্রী কাছিমের সাথে এবং একটি স্ত্রী কাছিম একাধিক পুরুষ কাছিমের সাথে প্রজননে অংশ নেয়।
  • প্রজনন মৌসুম ও মিলন: এদের প্রজনন কাল সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় হয়ে থাকে। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই সময়ে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। এদের মিলন প্রক্রিয়াটি পানির নিচে সম্পন্ন হয়। মিলনকালে পুরুষ কাছিমটি তার নখ ব্যবহার করে স্ত্রী কাছিমের পিঠের খোলস শক্ত করে ধরে রাখে।
  • যৌন পরিপক্বতা: একটি পুরুষ কাছিম ৪ থেকে ৫ বছর বয়সেই প্রজননের জন্য প্রস্তুত বা পরিপক্ব হয়ে ওঠে। তবে স্ত্রী কাছিমের পরিপক্ব হতে কিছুটা বেশি সময় লাগে, সাধারণত ৮ থেকে ১০ বছর। এরা বছরে ৩ থেকে ৪ বার প্রজনন করতে পারে।
  • ডিম পাড়া ও বাসা তৈরি: এরা মূলত ডিম্বজ (Oviparous) প্রাণী। মা কাছিম রাতের বেলা জলাশয়ের কাছাকাছি স্যাঁতসেঁতে ও বালুময় কাদা মাটিতে নিরাপদ বাসা তৈরি করে। এরা একবারে ১ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে। ডিমের সংখ্যা এবং বাচ্চার আকার মা কাছিমের বয়স ও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।
  • ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়া (Incubation): মা কাছিম ডিম পেড়েই তার দায়িত্ব শেষ করে এবং ডিমগুলো রেখে চলে যায়। এরপর প্রায় ১৮ থেকে ২০ সপ্তাহ প্রজননকাল (Incubation Period) শেষে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। সদ্য জন্মানো বাচ্চার আকার সাধারণত ৩২ থেকে ৪৯ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বর্তমান সংকট ও বিলুপ্তির হুমকি:

  • বাণিজ্যিক শোষণ ও শিকার: এশিয়ার বিভিন্ন জলাভূমি ও নদীতে বাস করা এই পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছে। মূলত মাংসের চাহিদা মেটাতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবৈধ পোষা প্রাণী (Pet Trade) হিসেবে বিক্রির জন্য এদের ব্যাপক হারে শিকার করা হচ্ছে।
  • জনসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ: এই কাছিমটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অতিরিক্ত শোষণের কারণে প্রকৃতিতে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
  • ভবিষ্যতের আশঙ্কা: বর্তমানে পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম বিলুপ্তির যে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নির্বিচারে শিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংস হতে থাকলে এই অনন্য প্রজাতিটি পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে আর বেশি সময় লাগবে না।

বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা:

  • স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাদ্যের উৎস: এশিয়া ও ভারতের যেসব অঞ্চলে পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম পাওয়া যায়, সেখানকার বাণিজ্যিক ব্যবসায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার সারাওয়াক (Sarawak) সংস্কৃতিতে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। যেসব দুর্গম এলাকায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বা বিকল্প কম, সেখানে স্থানীয় মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে এই কাছিম শিকার করা হয়।
  • অতিরিক্ত শোষণের প্রভাব: অতিরিক্ত বাণিজ্য এবং নির্বিচারে শিকারের ফলে প্রকৃতিতে এদের বংশবৃদ্ধির হারের চেয়ে বিলুপ্তির হার অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন এই অঞ্চলের বাজারগুলোতে লাখ লাখ কাছিম কেনাবেচা ও পাচার হচ্ছে, যা এদের প্রাকৃতিক জনসংখ্যাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
  • আন্তর্জাতিক আইন ও নিষেধাজ্ঞা: একটা সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও এই কাছিমের বিচরণ ছিল এবং তারা এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত ছিল। কিন্তু যখন দেখা গেল যে এই বাণিজ্যের কারণে প্রজাতিটি চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন মার্কিন সরকার আইন করে Amyda cartilaginea ক্রয়-বিক্রয় ও বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আমেরিকার এই কঠোর পদক্ষেপের পর বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই কাছিম রক্ষায় বাণিজ্য নিষিদ্ধের মতো আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

আইইউসিএন স্ট্যাটাস এবং আইনি সীমাবদ্ধতা:

  • আইইউসিএন রেড লিস্ট (IUCN Red List): আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত বাণিজ্যের কারণে প্রকৃতিতে পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এই সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এই কাছিমটিকে “Vulnerable” বা ‘সংকটাপন্ন’ প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে。 এর অর্থ হলো প্রাণীটি এখনো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত না হলেও, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
  • আইনের কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা: প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিকভাবে এর কেনাবেচা ও পাচার কমানোর জন্য বেশ কিছু কঠোর আইন তৈরি করা হয়েছে। তবে বড় সমস্যা হলো, স্থানীয়ভাবে খাবারের জন্য এই কাছিম শিকার বা আহরণের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই।
  • খাদ্যের স্থানীয় বাজার ও মাংসের চাহিদা: মানুষের খাদ্য হিসেবে এই কাছিম বিক্রির বাজারটি সবচেয়ে বড়। কাছিমের তাজা মাংসের জন্য স্থানীয়ভাবেই সিংহভাগ শিকার করা হয়, যা সহজেই স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন থাকা সত্ত্বেও কাছিমের সংখ্যা হ্রাসের গতি থামানো যাচ্ছে না।
  • ভেষজ ও ঔষধি ব্যবহার: কেবল প্রোটিনের চাহিদা মেটাতেই নয়, বরং বিভিন্ন দেশে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও ভেষজ ওষুধ (Medicinal Purposes) তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও এই পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মাংস পাচার ও ব্যবহার করা হয়।

আচরণ, যোগাযোগ ও মনস্তত্ত্ব:

  • যোগাযোগ ও অনুভূতি (Communication & Perception): পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম একে অপরের সাথে যোগাযোগের জন্য স্পর্শ (Tactile) এবং রাসায়নিক (Chemical) মাধ্যম ব্যবহার করে। এছাড়া এরা চারপাশের পরিবেশ বোঝার জন্য দৃষ্টিশক্তি, স্পর্শ এবং পানির কম্পন (Vibration)-কে সংকেত হিসেবে কাজে লাগায়।
  • নাকের বহুমুখী ব্যবহার: এদের লম্বা নাক বা স্নআউট শুধু শ্বাস নেওয়ার জন্যই নয়, বরং শিকারের খোঁজ পেতে এবং শিকারী প্রাণীর গন্ধ শুঁকে বিপদ আঁচ করতেও সাহায্য করে।
  • একাকী স্বভাব ও আত্মরক্ষা: প্রজনন সময় ছাড়া এই কাছিমগুলো সাধারণত সম্পূর্ণ একাকী (Solitary) জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। এরা আত্মরক্ষা এবং শিকার ধরার জন্য কাদার নিচে শরীর লুকিয়ে রাখে। তবে কোনো কারণে নিজেদের বিপন্ন মনে করলে এরা বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং বেশ জোরে কামড় (Painful Bite) দিতে পারে; যদিও এদের কামড়ে মানুষের বড় কোনো ক্ষতি হয় না।
  • দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা: কাদা, খাল, পুকুর বা ঘোলা পানিতে বসবাসের কারণে এদের চোখ খুব একটা শক্তিশালী নয়। এরা মূলত ঝাপসা বা অস্পষ্ট দৃষ্টিশক্তির (Fuzzy Vision) অধিকারী।
  • মানুষের সাথে সম্পর্ক ও পোষা প্রাণী হিসেবে যোগ্যতা: মানুষের সাথে এদের কোনো ধরনের আত্মিক বন্ধন তৈরি হয় না এবং এরা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। এদের হিংস্র আচরণ এবং বিশেষ বন্য স্বভাবের কারণে এরা কখনোই পোষা প্রাণী (Pet) হিসেবে উপযুক্ত নয় এবং এদের কোনোদিনই গৃহপালিত করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশে আবিষ্কার এবং আইনি সুরক্ষা:

  • প্রথম আবিষ্কারের ইতিহাস: বাংলাদেশে পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমের উপস্থিতি খুব বেশিদিনের জানা নয়। নভেম্বর ২০১১ সালে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. মনিরুল খান প্রথমবার বাংলাদেশে এই প্রজাতিটির উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। তার এই আবিষ্কার দেশের জীববৈচিত্র্যের তালিকায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
  • বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনের সুরক্ষা: প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এবং এর চোরাচালান বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এর তফসিল-১ অনুযায়ী এই পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমকে সম্পূর্ণ ‘রক্ষিত বন্যপ্রাণী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
  • শিকার ও পাচারের শাস্তি: এই নতুন আইনানুযায়ী, বাংলাদেশে এই কাছিম ধরা, শিকার করা, নিজের কাছে রাখা, কেনাবেচা করা বা এর ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References)

১. সম্পাদনা ও আপডেট বিজ্ঞপ্তি: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ৩ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিক তথ্য বজায় রাখতে আজ ২৬ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হয়েছে।

পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)

প্রশ্ন ১: পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমের বৈজ্ঞানিক নাম কী?

উত্তর: পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিমের মূল বৈজ্ঞানিক নাম হলো Amyda cartilaginea। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘Asiatic Softshell Turtle’ নামে পরিচিত।

প্রশ্ন ২: এই কাছিমগুলো ওজনে কত বড় হতে পারে?

উত্তর: এদের গড় ওজন সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরা সর্বোচ্চ ১০৫ কেজি পর্যন্ত ওজনেরও হতে পারে।

প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশে পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম প্রথম কবে এবং কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: বাংলাদেশে এই কাছিমটির উপস্থিতি প্রথম নিশ্চিত করেন বন্যপ্রাণী গবেষক ড. মনিরুল খান, নভেম্বর ২০১১ সালে

প্রশ্ন ৪: পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম কি পোষা প্রাণী হিসেবে রাখা সম্ভব?

উত্তর: না, এই কাছিমগুলো সম্পূর্ণ বন্য ও একাকী স্বভাবের। বিপদে পড়লে এরা বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং জোরে কামড় দিতে পারে। মানুষের সাথে এরা কোনো আত্মিক বন্ধন তৈরি করে না, তাই এরা পোষার জন্য একদমই উপযুক্ত নয়।

প্রশ্ন ৫: বাংলাদেশে এই কাছিম শিকারের বিরুদ্ধে কী আইন রয়েছে?

উত্তর: বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এর তফসিল-১ অনুযায়ী পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম একটি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। ফলে এটি শিকার, কেনাবেচা বা নিজের কাছে রাখা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!