ভেন্না বা ভেরেন্ডা (বৈজ্ঞানিক নাম: Ricinus communis, ইংরেজি নাম: Castor, Castor Bean, Castor-oil) হচ্ছে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ভেষজ উদ্ভিদ। এই ভেন্নার বীজ থেকেই তৈরি হয় ক্যাস্টর ওয়েল বা তেল।
রেড়ি বা ক্যাস্টর তেল প্রস্তুতের প্রাচীন পদ্ধতি:
রেড়ির বীজ মাটিতে ২ দিন রেখে (খড় চাপা দিয়ে, গোবর জল ছিটিয়ে) সেইগুলিকে রৌদ্রে সামান্য শুকিয়ে নিলেই অল্প আঘাতে খোসা ছাড়ান যায়। বেশ করে ঝেড়ে নিয়ে খোলায় ভেজে, ঢেকিতে বা হামানদিস্তায়ে কুটে জল দিয়ে ফাটালেই রেড়ির তেল ভেসে উঠবে, পরে ছে’কে জলটাকে মেরে নিলেই পরিষ্কার রেড়ির তেল হয়। যাঁদের অবস্থা ভাল তাঁরা ঘানিতেই পিষে নিতেন; তবে প্রাথমিক কাজ করতেই হবে। সুশ্রুতে বলা আছে যন্ত্রে পিষা তেলর অপেক্ষা সিদ্ধ তেল ভালো ও স্নিগ্ধগুণ সম্পন্ন। পাকাশয় বা অন্ত্রে কোনো উদ্বেগ হয় না। যন্ত্রে পেশা তেল রুক্ষতা আনে।
ক্যাস্টর তেলের ব্যবহার:
১. পেট ফাঁপায়: দাত পরিষ্কার হয় না, আবার পেটও অল্প ফাঁপে, এ ক্ষেত্রে গরম জলের সঙ্গে আধ বা এক চামচ ভেন্না বা রেড়ি-র তেল খেতে দিতেন প্রাচীন বৈদ্যরা, তবে বয়স হিসেবে মাত্রা ঠিক করে দিতেন।
২. ক্রিমি উপদ্রবে: মলদ্বারে এসে প্রায় রোজই জ্বালাতন করে, অস্থিকর অবস্থা; এ ক্ষেত্রে দুই একদিন অন্তর ৫ থেকে ১০ ফোটা থেকে আরম্ভ করে ১ চামচ পর্যন্ত (বয়সানুপাতে) একই গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে দিতে হয়। এটাতে অনেকের কেচো কিমিও বেরিয়ে যায়।
৩. বৃদ্ধি বা বাতজ রোগ: যাঁদের অণ্ডকোষের বহিরাবরণের চর্মধারে জল জমেনি অথচ আকারে বড় হয়ে আছে; সেক্ষেত্রে ভেন্না বা রেড়ি-র ১ চামচ করে একই গরম দুধে মিশিয়ে এক দেড় মাস খেতে হয়; সেটা খালিপেটে ভোরের দিকে খেলে ভাল হয়। এটা সুশ্রুত সংহিতার ব্যবস্থা।
৪. পিত্তল (Biliary colic): পিত্তনিঃসারক স্রোতপথের আকস্মিক আক্ষেপ (spasm) মাঝে মাঝে হতে থাকে, এ ক্ষেত্রে যষ্টিমধু, (Glycyrrhiza glabra) ৫ থেকে ৬ গ্রাম থেতো করে এবং সিদ্ধ করে এক ছটাক আন্দাজ থাকতে নামিয়ে, সেটাতে আন্দাজ ১ চামচ চিনি মিশিয়ে খেলে ওটা চলে যাবে। এটা রাত্রে শয়নকালে অথবা ভোরের দিকে খেতে হয়।
৫. মূত্র শূলে: এরণ্ড তেলের সঙ্গে ১ চামচ আদার রস অল্প গরমজলে মিশিয়ে খেলে এটা উপশম হয়, তবে এর গন্ধটা বিরক্তিকর, বর্তমান ক্ষেত্রে গন্ধবিহীন (Odourless Castor oil) ভেন্না বা রেড়ি-র তৈলের ব্যবহার চলছে। পায়ের শিরা কেচোর মতো জড়িয়ে যাচ্ছে ও মোটা হয়েছে, পেশীগুলিও শক্ত, মাঝে মাঝে টনটন করা, ব্যথা ও যন্ত্রণা উপসর্গ আছে। সেক্ষেত্রে প্রত্যহ অল্প গরম দুধের সঙ্গে এক বা আধ চামচ মাত্রায় খাওয়া। এটা কিন্তু বিরেচন হিসেবে ব্যবহার করা নয়, রগত বায়কে নিবারণ করার জন্য। এর সঙ্গে পায়ে আস্তে আস্তে এই তৈলের মালিশ ব্যবস্থা।
৬. কেটে গেলে: এরণ্ড তেলে হলুদের গুড়ো মিশিয়ে কাটা জায়গায় চেপে বেধে দিলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায় ও ব্যথা হয় না এবং তাড়াতাড়ি জুড়ে যায় এবং থেতলে গেলেও এইভাবে লাগাতে হয়।
৭. কোনো জায়গা পুড়ে গেলে: পোড়া জায়গাটা আস্তে আস্তে মুছে দিয়ে তৎক্ষণাৎ ভেন্না বা রেড়ি-র তেলে তুলা দিয়ে আস্তে আস্তে লাগাতে হয়। লাগানোর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে পোড়র জ্বালা কমে যায়। এ ক্ষেত্রে ক্ষত হলে একটু, সাদা ধনিয়ার গুড়ের সঙ্গে মলম করে লাগালে সেরে যায়।
৮. শিশুদের পেট কামড়ানিতে: কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, পেটে অল্প অল্প বায়ু হয়েছে, সেক্ষেত্রে ভেন্না বা রেড়ি-র তেল আর জল একসঙ্গে ফেটিয়ে নাভির চারিদিকে লাগিয়ে আস্তে আস্তে মালিশ করে দিতে হয়; এটাতে অল্প সময়ের মধ্যে কষ্টটা চলে যায়।
৯. সাদা দাগে: গায়ের মাঝে মাঝে ফুটফুট দাগ। সেক্ষেত্রে ভেন্না বা রেড়ি-র তেল প্রত্যহ বা এক দিন অন্তর গায়ে মাখতে হয় অথবা ঐ দাগগুলিতে লাগাতে হয়। এমন কি শ্বেতির শ্বিত্র রোগ ঠিক প্রথমাবস্থায় এই তেল দিনে ২ থেকে ৩ বার করে লাগাতে হয়। তবে কমপক্ষে ২ থেকে ৩ মাস না লাগালে এই ক্ষেত্রে ফল দেখা যায় না।
১০. অচিলের ঘা: অনেকে আঁচিলে চুণ, সোডা লাগিয়ে তুলে দেন, সেখানে ক্ষতও হয়, সেই ক্ষতে এরন্ড তেল লাগালে সেরে যায়।
১১. বাতের ব্যথায়: সৈন্ধব লবণের সঙ্গে গরম এরণ্ড তেল মিশিয়ে ভাল করে পিষে ওটা ব্যথার জায়গায় লাগাতে হয়, এটাতেও কিছু উপশম হবে।
১২. চোখে পানি ঝরা: চোখে বালি বা ময়লা পড়ে জল ঝরতে থাকলে পালকে করে চোখে লাগিয়ে দিলে ওটা বন্ধ হয়।
সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্র:
১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা,২৬০-২৬৪।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।