ভূমিকা: নাগেশ্বর (বৈজ্ঞানিক নাম: Mesua ferrea) হচ্ছে এক প্রকারের ভেষজ বৃক্ষ। এই প্রজাতিটি এশিয়ার দেশে জন্মায়।
নাগেশ্বর-এর বর্ণনা:
এই প্রজাতিটি মধ্যম থেকে বৃহৎ আকৃতির চিরহরিৎ বৃক্ষ। ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। তরুণ অবস্থায় চূড়া ঘন কোণাকার, বাকল ভস্মতুল্য ধূসর, পরবর্তীতে লালাভ বাদামী, গোলাকার পাত্রের ন্যায় স্তরে স্তরে উঠে আসে, ঝরে পড়া বাকলের স্থান লালাভ, নিসৃত গদ গন্ধ যুক্ত, রজন তরুণ বিটপে প্রথমে উজ্জল লাল পরে ফ্যাকাশে লাল এবং ক্রমান্বয়ে গাঢ় সবুজে পরিনত হয়। পত্র সরল, তির্যকপন্ন, প্রতিমুখ, ৩.৫ × ১৫.০ × ১.৫-৩.০ সেমি, অতিরিক্ত পরিবর্তনশীল, রৈখিক- ভল্লাকার বা উপবৃত্তাকার-দীর্ঘায়ত, সূক্ষ্মাগ্র থেকে দীঘ্রাগ্র, তরুণ অবস্থায় তামাটে লাল, শক্ত চর্মবৎ অখন্ড, উর্ধ্বাংশ গাঢ় সবুজ ও উজ্জ্বল, অক্ষীয় পৃষ্ঠ মোমতুল্য সাদা গুড়ায় আবৃত। পার্শীয় শিরা বহু, সূক্ষ্ম, সমান্তরাল, অস্পষ্ট, বৃত্ত ০.৫-১.৫ সেমি লম্বা।
পুষ্প সাদা, আড়াআড়ি ৪-৮ সেমি, একল, কদাচিৎ জোড়া বদ্ধ, সুগন্ধী, অবৃন্তক, উপরের পত্রের কক্ষে জন্মে, মঞ্জরীদন্ড খাটো, মরচে রোমশ, প্রায় ০.৫ সেমি লম্বা, বৃত্যংশ ৪ টি, ০.৮-১.৫ সেমি লম্বা, ২ সারিতে বিন্যস্ত, অবতল, রসালো বর্তুলাকার, আভ্যন্তরীন জোড়া দীর্ঘতর, বহির্ভাগ মখমল সদৃশ অণুরোমশ, স্থায়ী, পাপড়ি ৪ টি, সাদা, পাতলা, বিডিম্বাকার বা বিহৃৎপিন্ডাকার, মূলীয় অংশ কীলকাকার বিস্তৃত, প্রান্ত কুঞ্চিত, শিরা সরু বাদামী বা বেগুনি লাল, প্রান্তআচ্ছাদী, পর্ণমোচী।
পুংকেশর অসংখ্য, পুষ্পের কেন্দ্রস্থলে হলুদ গোলকের ন্যায় বিন্যস্ত, পুংদন্ড ভ সরু ৪-৫ মিমি লম্বা, পরাগধানী রৈখিক, ৩ মিমি লম্বা, সুবর্ণি হলুদ, পাদলগ্ন। গর্ভাশয় ডিম্বাকার, ২-কোষী, ডিম্বক প্রতিকোষে ২ টি, গর্ভদন্ড সূত্রাকার, গর্ভমুন্ড খাটো, ছত্রবদ্ধ। ফল বেরি, ৩-৫ × ৩.৪ সেমি, ডিম্বাকার থেকে গোলাকার, শীর্ষ কোণাকৃতি, গাঢ় বাদামী, মসৃণ, মূলীয় অংশ বৃহৎ স্থায়ী বৃত্যংশ দ্বারা আবৃত। বীজ ১-৪ টি, চকচকে বাদামী, বীজ বহিত্বক শক্ত, বীজপত্র ফ্যাকাশে বাদামী, রসালো ও তৈলাক্ত। ক্রোমোসোম সংখ্যা : 2n = ৩২
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
লাল মাটি যুক্ত সুনিষ্কাশিত ভূখন্ড যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা বিদ্যমান। ফুল ও ফল ধারণ ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস। বীজ দ্বারা বংশ বিস্তার হয়।
বিস্তৃতি:
কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয় পেনিনসুলা, মায়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় জন্মে। এছাড়া গৃহাঙ্গেনে রাস্তার পার্শ্বে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এভিনিউ গাছরূপে লাগনো হয়।
ব্যবহার:
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এই উদ্ভিদের গুরুত্ব বহুবিধ। কাঠ, রজন তেল, ভেষজ ঔষধ উৎপাদনকারী এবং বাহরি বৃক্ষ রূপে এর ব্যবহার প্রচলিত। কাঠ ভারি ও শক্ত এবং টেকসই হওয়ায় সাধারণ নির্মাণ সেতু, অট্টালিকা, গৃহের অভ্যন্তরে খুঁটি, যন্ত্রপাতির হাতল, বন্দুক তৈরির কাঠ, রেললাইনের নিচে ব্যবহৃত তক্তা প্রভৃতি কাজে গুরুত্বপূর্ণ। রজন বার্নিশের জন্য ব্যবহার করা হয়। বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল সাবান তৈরির অন্যতম উপাদান। শুকনা ফুল প্রসাধনী শিল্পে এবং সঙ্কোচক রূপে ভেষজ ঔষধে ব্যবহার করা হয়। এছড়া কাশি ও পেটের পীড়ায় এই ফুল উপকারী। বাকল সঙ্কোচক ও গন্ধযুক্ত, মূল ও বাকল থেকে তিক্ত টনিক তৈরি হয়। তেল সাপের কামড়ে উপকারী। পার্ক বৌদ্ধ মন্দির ও রাস্তার পাশে বাহারি বৃক্ষরূপে রোপণ করা হয়। ভারতের কোন কোন অংশে ফুল সঙ্কোচক রূপে ব্যবহার করা হয়। মাখন চিনি ও ফুল থেকে তৈরি লেই রক্ত-অর্শ ও পায়ের পাতার যন্ত্রনাপূর্ণ অনুভূতিতে প্রয়োগ করা হয়। পুষ্প মুকুল থেকে তৈরি সিরাপ ভারতে জটিল আমাশয় রোগে ব্যবহার করা হয়। ভারত ও শ্রীলংকায় বীজ আহার্যরূপে বিবেচিত। শ্রীলংঙ্কায় মাথা ব্যথা নিরাময়ের জন্য পাতা দিয়ে সেক দেয়া হয়। সুগন্ধের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় পুংকেশর বালিশে ব্যবহার করা হয়।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ০৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) নাগেশ্বর প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে নাগেশ্বর সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ০৭, পৃষ্ঠা ২৩৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: A. J. T. Johnsingh
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।