ভূমিকা: সিন্দুরি (বৈজ্ঞানিক নাম: Mallotus philippensis) হচ্ছে এক প্রকারের ভেষজ গাছ। এই প্রজাতিটি এশিয়ার দেশে জন্মায়।
সিন্দুরি গাছ-এর বর্ণনা :
সিন্দুরি গুল্ম বা ছোট চিরহরিৎ বৃক্ষ। এটি প্রায় ১৫ মিটার উঁচু, কান্ড বাঁশের ছেঁদার ন্যায় খাঁজ যুক্ত, তরুণ বিটপ, পত্র ও পুষ্পবিন্যাস হলদে বা মরচে রোমশ। পত্র একান্তর বা অর্ধপ্রতিমুখ, উপপত্র ক্ষুদ্র, আশুপাতী, বৃন্ত ২-৬ সেমি লম্বা, হলদে বা মরচে রোমশ বা অর্ধরোমশ, পত্র ফলক ডিম্বাকার – থেকে ডিম্বাকার ভল্লাকার, ৫-১৫ × ২-৮ সেমি, সূক্ষ্মাগ্র বা দীর্ঘাগ্র, মূলীয় অংশ কীলকাকার, গোলাকার বা অর্ধ- – কর্তিতাগ্র, পার্শ্বীয় শিরা ৩-৮ জোড়া উপরের পৃষ্ঠ রোমশ বিহীন, নিচের পৃষ্ঠ সামান্য রোমশ এবং সূক্ষ্ম গ্রন্থিযুক্ত।
পুংপুষ্পবিন্যাস প্রান্তীয়, স্পাইকেট বা রেসিমোস, প্রায়শ গুচ্ছবদ্ধ এবং প্যানিকেল সদৃশ ১০ সেমি লম্বা, বহুপুষ্প । বিশিষ্ট, মঞ্জরীপত্র ১ মিমি স্থায়ী। পুং পুষ্প অর্ধবৃত্তক বা ১ – মিমি বৃন্তযুক্ত, বৃতিখন্ড ২.১-৩.২ × ১.০-১.৫ মিমি, ডিম্বাকৃতি ভল্লাকার থেকে ভল্লাকার, সূক্ষ্ণাগ্র, গ্রন্থিল, সামান্য রোমশ, পুংকেশর ৩ মিমি লম্বা, পরাগধানী ০.৮ মিমি লম্বা, শীর্ষ গ্রন্থিল।
স্ত্রীমঞ্জরী পুংমঞ্জরী অপেক্ষা খাটো এবং ঘন সন্নিবিষ্ট পুষ্পযুক্ত। স্ত্রীপুষ্প অবৃন্তক বা অর্ধবৃত্তক, বৃতিখন্ড ৩-৫টি, ত্রিকোণাকার-ডিম্বাকার, ১.৫ মিমি লম্বা, গর্ভাশয় অর্ধগোলাকার, ১ মিমি ব্যাস বিশিষ্ট, রোমশ, গর্ভদন্ড ২-৩ মিমি লম্বা, পক্ষল, সবুজ। ফল ৮-১০ x ৫-৬ মিমি, ৩ খন্ডিত, মাঝে মাঝে ৪ খন্ডিত, মসৃণ, প্রকোষ্ঠ বিদারী। বীজ আড়াআড়ি ৪ মিমি, গোলাকার, মসৃণ, কালো।
ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ২২ (Datta, 1967).
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
পাথরযুক্ত পাহাড়ী ঢাল, প্রাথমিক ও গৌণ অরণ্য, ম্যানগ্রোভ অরণ্যের কিণারা, গৃহ-আঙ্গিনা, গুল্মভূমি, তৃণভূমি। ফুল ও ফল ধারণ সময়কাল সারাবর্ষ ব্যাপী। বংশ বিস্তার হয় বীজে বংশ বিস্তার।
বিস্তৃতি :
হিমালয়ের পশ্চিমাঞ্চল, শ্রীলংকা, থেকে চীন, সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ও মালেসিয়া। বাংলাদেশের সর্বত্র জন্মে।
সিন্দুরি গাছ-এর ব্যবহার:
ফল কৃমিনাশক ও রেচক, পত্র মূত্রবর্ধক, বাকল ও পাতা চর্মরোগে উপকারী। কাষ্ঠের ক্বাথ কিডনি ও পেশি স্ফীতি রোগে ব্যবহার করা হয়। পত্র, ফল ও মূল মধুর সাথে মিশ্রিত করে বিষাক্ত কামড়, অস্থিভঙ্গ, দাদ ও চর্ম পীড়ায় প্রয়োগ করা হয়, কাষ্ঠ জ্বালানি ও যন্ত্রপাতির হাতল রূপে ব্যবহার করা হয়। রেশমি ও পশমী কাপড় রংয়ের কাজে ফল গুরুত্বপূর্ণ। বীজের তেল বাণিজ্যের কাজে এবং পাতা গবাদিপশুর খাদ্যরূপে ব্যবহার করা হয়।
জাতিতাত্বিক ব্যবহার:
থাইল্যান্ডে বীজ ক্ষুধা উদ্রেককারী ও মাথা ঝিম ঝিম করা নিরগণকারী রূপে ব্যবহৃত। পাতার ক্বাথ পাপুয়া নিউগিনির অধিবাসীবৃন্দ উদরাময় ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোগের চিকিৎসা করে। ভারতের লোধা আদিবাসী সম্প্রদায় বাকল ও মূল দ্বারা বাত রোগের চিকিৎসা করে। তারা শিশুদের প্লীহা বৃদ্ধির জন্য ফলের ক্বাথ ব্যবহার করে। কুষ্ঠরোগের চিকিৎসায় আরবরা মূল থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরি করে। মায়ানমারে কাটা ও ক্ষতস্থানে বীজের লেই তৈরি করে চিকিৎসা করা হয়।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) সিন্দুরি প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে সিন্দুরি সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. এম অলিউর রহমান (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৭ম, পৃষ্ঠা ৪৬৫-৪৬৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।